সঠিক গভর্ন্যান্স ও কার্যকর তদারকির অভাবে দেশের ব্যাংকিং খাত মারাত্মক সংকটে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান হাবিব মনসুর। তিনি বলেন, পরিবারতন্ত্র ও অনিয়মের মাধ্যমে গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং খাত থেকে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশের বাইরে পাচার হয়েছে।
বুধবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ‘ব্যাংকিং খাত: বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক লোকবক্তৃতা সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গভর্নর।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ৬১টি ব্যাংক কার্যক্রম চালাচ্ছে, যা বাস্তব চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। গভর্নরের মতে, বাংলাদেশের জন্য ১০ থেকে ১৫টি সুসংগঠিত ব্যাংকই যথেষ্ট। ব্যাংকের সংখ্যা কমানো গেলে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, দুর্বৃত্তায়ন ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে, যার বড় একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিষয়ে গভর্নর বলেন, সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে দুটি রাখার পরিকল্পনা করছে এবং বাকি ব্যাংকগুলোকে একীভূত (মার্জ) করা হবে।
খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী মার্চের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে সংশোধিত বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ জারি না হলে ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতে আবারও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
গভর্নর আরও জানান, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ‘ব্যাংক রেজ্যুলিউশন ফান্ড’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই তহবিলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা জমা করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একই রেজ্যুলিউশন কাঠামোর আওতায় আনা হবে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তবে বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের ফলে এই খাত ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শরিফ মোশারফ হোসেন বলেন, ঋণ খেলাপির হার বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম সংকুচিত হচ্ছে, যার প্রভাব বিনিয়োগে পড়ছে। তিনি ব্যাংকিং খাতকে আরও কঠোর নজরদারির আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্যসচিব অধ্যাপক ড. মো. হেলাল উদ্দিন স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।
