ঘুমের সঙ্গে আপস: প্রযুক্তি ও ব্যস্ততায় বদলে যাওয়া রুটিন

সি. এফ. জামান:

3 Min Read
ছবি - সংগৃহীত।

রাত জাগা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠছে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস। শহরের ব্যস্ততা, কাজের চাপ আর দীর্ঘ স্ক্রিন টাইম সব মিলিয়ে বাংলাদেশও নিঃশব্দে ঘুমের সঙ্গে আপস করছে। আমরা জেগে আছি ঠিকই, কিন্তু ঠিক সময়ে না।

দিন যত ব্যস্ত হচ্ছে, রাত ততই হয়ে উঠছে এক ধরনের আশ্রয়। অনেকের জন্য রাত মানে শুধু বিনোদন নয়, বরং নিজের মতো করে সময় কাটানোর একমাত্র সুযোগ। কাজ, যানজট, পারিবারিক দায়িত্ব সবকিছু দিনের সময়টাকে দখল করে রাখে। ফলে রাতই হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত সময়ের জায়গা।

এই প্রেক্ষাপটে “রিভেঞ্জ বেডটাইম প্রোক্রাস্টিনেশন” ধারণাটি অজান্তেই আমাদের মাঝে জায়গা করে নিচ্ছে। অর্থাৎ মানুষ ইচ্ছা করেই ঘুম পেছাচ্ছে, দিনে হারানো ব্যক্তিগত সময়টা ফিরে পাওয়ার জন্য। একসময় যেখানে রাত মানেই ছিল নির্দিষ্ট রুটিন- খাবার, টিভি, তারপর ঘুম। আজ সেই ছন্দ অনেকটাই বদলে গেছে।

এখন একটি ছোট্ট স্ক্রল অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টায় গড়ায়। সোশ্যাল মিডিয়ার এক পোস্ট থেকে আরেক পোস্ট, একটি ভিডিও থেকে আরেকটি; চক্রটা যেন শেষই হয় না। মেসেজিং অ্যাপেও কথোপকথন চলতেই থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। ফলে ঘুম আর অভ্যাস নয়, বরং এক ধরনের ‘পরে করা যাবে’ সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়।

এটি শুধু আচরণগত পরিবর্তন নয়, এর পেছনে রয়েছে শারীরিক কারণও। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার কিশোরদের মধ্যে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার হয়, আর ঘুমের গড় সময় প্রায় ৭.১ ঘণ্টা । আবার চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড় স্ক্রিন টাইম ৮ ঘণ্টারও বেশি, এবং ৬৩% শিক্ষার্থীর ঘুমের মান খারাপ ।

অন্যদিকে স্ক্রিনের নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ বিলম্বিত করে, ফলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই দেরিতে ঘুমানোর দিকে ঠেলে যায়। অর্থাৎ আমরা শুধু ইচ্ছা করে জেগে থাকছি না, আমাদের শরীরও ধীরে ধীরে সেই অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।

খাবারের অভ্যাসও বদলাচ্ছে একইভাবে। রাতের দিকে খাবার অর্ডার করা বা হালকা নাস্তা এখন অনেকের রুটিনের অংশ। কিন্তু দেরিতে খাওয়া হজমে সমস্যা তৈরি করে, ঘুম আরও বিলম্বিত করে এবং পরের দিন ক্লান্তি বাড়ায়। ফলে একটি চক্র তৈরি হয় – স্ক্রল, খাওয়া, আবার স্ক্রল।

শহুরে জীবন এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করছে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিয়মিত সময়সূচি, এমনকি আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী কাজ করার প্রবণতা সব মিলিয়ে “আগে ঘুমানো” এখন অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হয়।

তবে এর প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ঘাটতি মনোযোগ কমায়, মেজাজে প্রভাব ফেলে এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। বাংলাদেশে একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে প্রাপ্তবয়স্কদের গড় ঘুম প্রায় ৭.৭ ঘণ্টা হলেও অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম বা বেশি ঘুমাচ্ছেন, যা স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দেয় ।

- Advertisement -

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি শুধু অভ্যাসের পরিবর্তন নয়; এটি আমাদের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন। নির্দিষ্ট রুটিনের জায়গা নিচ্ছে অন-ডিমান্ড জীবনধারা। কাজ বাড়ছে, বিশ্রাম পেছাচ্ছে।

এই বাস্তবতায় রাত জাগা কখনো পছন্দ, কখনো বাধ্যবাধকতা। এর মাঝখানে রয়েছে একটাই বিষয়, নিজের জন্য সময় বের করার চেষ্টা।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু “কখন ঘুমাচ্ছি” নয়, বরং “কিসের জন্য জেগে আছি?” আর এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আমাদের ঘুমের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে।

- Advertisement -
newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *