ধুরন্ধর ও ধুরন্ধর ২ : বলিউডে প্রোপাগান্ডা রাজনীতির নতুন অধ্যায়

মনিরুল ইসলাম :

6 Min Read
গ্রাফিক্স ছবি।

ভারতের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে সিনেমা এখন আর শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং জনমত গঠন ও রাজনৈতিক বার্তা প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে উঠে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘ধুরন্ধর’ এবং এর সিক্যুয়াল ‘ধুরন্ধর ২’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে চলচ্চিত্র দুটি কি নিছক রাজনৈতিক থ্রিলার, নাকি নরেন্দ্র মোদী এবং ভারতীয় জনতা পার্টির ভাবমূর্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই নির্মিত।

ধুরন্ধর বিতর্ক চলছে প্রোপাগান্ডা নাকি রাজনৈতিক থ্রিলার এ নিয়ে, মোদী ও বিজেপির ইমেজ নির্মাণে কতটা প্রভাব ফেলছে এই সিনেমা তা এখন আলোচনার বিষয়।

প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্র সাধারণত এমনভাবে নির্মিত হয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ বা নেতৃত্বকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয় এবং বিকল্প মত বা সমালোচনাকে সীমিত রাখা হয়। ইতিহাসে বিভিন্ন দেশেই এই ধারা দেখা গেছে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে সিনেমাকে ব্যবহার করা হয়েছে কৌশলগতভাবে। ভারতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটভিত্তিক সিনেমার সংখ্যা বেড়েছে, যেখানে বাস্তব রাজনীতির সঙ্গে কাল্পনিক কাহিনির মিশ্রণ ঘটিয়ে দর্শকের আবেগ ও চিন্তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা দেখা যায়।


 এর আগেও উড়ি (২০১৯) সিনেমায় নরেন্দ্র মোদীর ‘আলফা মেল’ নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠতে দেখা যায়। সেখানে পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে ভারতের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের ঘটনাকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা অনেক সমালোচকের মতে আংশিক সত্যনির্ভর বা ‘অর্ধসত্য’ বয়ান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।


বিশ্লেষকদের মতে, ধুরন্ধর চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র এমনভাবে নির্মিত হয়েছে, যা অনেকাংশেই নরেন্দ্র মোদীর জনসম্মুখে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ইমেজের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। দৃঢ় নেতৃত্ব, সংকটময় পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান এসব বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে একটি ‘Leader-centric narrative’ (নেতৃত্ব-কেন্দ্রিক আখ্যান) গড়ে তোলা হয়েছে, প্রোপাগান্ডা সিনেমার একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত এবং যা দর্শকের মনে নির্দিষ্ট ধরনের নেতৃত্বের ধারণা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।

চলচ্চিত্রে বাস্তব রাজনৈতিক ঘটনাকেও নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালের নোটবন্দী সিদ্ধান্তকে একটি কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয় এটি কালো টাকা দমন ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ছিল। যদিও বাস্তবে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে, সমালোচকদের মতে সিনেমাটি সেই বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে সরকারি বয়ানকেই প্রাধান্য দিয়েছে।

বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উপস্থাপন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, চলচ্চিত্রটিতে বিরোধী দলগুলোকে দুর্বল, অযোগ্য বা দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা একপাক্ষিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। বহুমাত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বা ভিন্নমতের উপস্থিতি সীমিত থাকায় এটিকে অনেকেই ‘ Selective storytelling’ বা ‘নির্বাচনী গল্পবলা’-এর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন, যা প্রোপাগান্ডা সিনেমার আরও পরিচিত বৈশিষ্ট্য।

এছাড়া আবেগ ও জাতীয়তাবাদের ব্যবহার চলচ্চিত্রটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। দেশপ্রেম, নিরাপত্তা সংকট এবং রাষ্ট্রীয় গৌরবের মতো উপাদানকে জোরালোভাবে তুলে ধরে দর্শকের আবেগকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের আবেগনির্ভর উপস্থাপন সাধারণ দর্শকের কাছে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ভারতের বেশ কয়েকজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর এই সিনেমাটিকে নরেন্দ্র মোদী ও ভারতীয় জনতা পার্টির ব্র্যান্ড নির্মাণের একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিকভাবে জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দিতে সাংস্কৃতিক মাধ্যমের ব্যবহার হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন।

বাণিজ্যিক দিক থেকেও ‘ধুরন্ধর’ উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। বক্স অফিসের আয় এবং দর্শকপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে জাতীয়তাবাদী ধাঁচের সিনেমার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। একই সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের প্রশংসা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা সিনেমাটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

- Advertisement -

তবে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, চলচ্চিত্রটি শিল্পের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।

তাদের মতে, এতে ইতিহাসের আংশিক উপস্থাপন, একমুখী রাজনৈতিক বয়ান এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্মাণের ছাপ রয়েছে। যদিও অন্য একটি অংশ এটিকে দেশপ্রেমমূলক ও বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র হিসেবেই দেখছেন।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ, ‘ধুরন্ধর’ ও ‘ধুরন্ধর ২’ জনপ্রিয় সংস্কৃতির মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। এটি সমর্থকদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া তৈরি করতে সক্ষম হলেও নিরপেক্ষ দর্শকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফলে চলচ্চিত্রগুলোকে এককভাবে প্রোপাগান্ডা বা নিছক বিনোদন হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন হলেও, নরেন্দ্র মোদী ও ভারতীয় জনতা পার্টির রাজনৈতিক ইমেজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শক্তিশালী বয়ান নির্মাণে এগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে।

- Advertisement -

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ‘দি অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইমমিনিস্টার’ সিনেমা নিয়ে অভিযোগ, নির্বাচনের আগে এটি কংগ্রেসের ইমেজ ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল এবং এর পেছনে ভারতীয় জনতা পার্টির ইন্ধনের অভিযোগ আছে।

সঞ্জয় বারুর লেখা বই অবলম্বনে তৈরি এই সিনেমায় গান্ধী পরিবারের প্রভাব, কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং মনমোহন সিংকে একজন ‘রিমোট কন্ট্রোল’ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন অনুপম খের, আর সঞ্জয় বারুর ভূমিকায় দেখা গেছে অক্ষয় খান্নাকে।

চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে যে মনমোহন সিং স্বাধীনভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না এবং নীতিনির্ধারণী কাজগুলো প্রায়শই সোনিয়া গান্ধীসহ গান্ধী পরিবারের প্রভাবিত। সিনেমার দৃষ্টিকোণ নেয়া হয়েছে মনমোহন সিং-এর মিডিয়া উপদেষ্টা সঞ্জয় বারুর দৃষ্টিতে, যেখানে তিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণের দিকে আলোকপাত করেছেন।


  সিনেমাটি রাজনীতিতে বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, এটি মনমোহন সিং-এর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার পাশাপাশি বিজেপির পক্ষে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার মতো কাজ করছে।


চলচ্চিত্রে তার দশ বছরের শাসনামলে ঘটে যাওয়া ভারত-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তি, দুর্নীতির কেলেঙ্কারি, এবং রাহুল গান্ধীকে সামনে আনার প্রচেষ্টা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *