বিপুল সিন্ডিকেটে নাশ সুফল বনায়ন

বিশেষ সংবাদদাতা :

7 Min Read

টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে চারা রোপণের নামে হরিলুটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক জায়গায় সাইনবোর্ড পাওয়া গেলেও গাছের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আবার কোন কোন স্থানে পরিচর্যার অভাবে রোপিত চারাগুলোর বেশিরভাগই মারা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালিন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক বিপুল কৃষ্ণ দাস ও দুই ফরেস্টার এফএও প্রকল্প ও বনায়নের নামে বিভিন্ন প্রকল্পে হরিলুটের নেতৃত্ব দিয়েছেন। লুটপাট করা অর্থ ভাগে ভাগে চলে যেতো বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে।

অভিযোগ রয়েছে, ৫ শতাংশ বিপুল কৃঞ্চ দাস, ৪ শতাংশ এসিএফদের, ২১ শতাংশ ডিএফও’দের, সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদের ভাই এরশাদও লোপাট করা এসব অর্থের ১ শতাংশ পেতেন। এছাড়া বনায়নের নামে ১৯ শতাংশ রেঞ্জ কর্মকর্তা এবং বিট অফিসারের বনায়ন বাবদ ৫০ শতাংশ কাজের জন্য বরাদ্দ দিত। রেঞ্জ কর্মকর্তাদের ১৯ শতাংশ ও বিট কর্মকর্তাদের ৫০ শতাংশ টাকা থেকে সিএফ’র কমিশন নিত বলে জানিয়েছন একাধিক ফরেস্টার। ফরেস্টার কামরুজ্জামান শোভন, ফছিউল আলম শুভ ওই সময় সিএফ-এর ইশারায় নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম অঞ্চলের করতেন বনের দুর্নীতি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরেস্টার কামরুজ্জামান শোভন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি জানান, তাদের (বন অধিদপ্তরের) কর্মকর্তাদের মাঝে দ্বন্ধ থেকে এসব অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ করা হচ্ছে। জানা যায়, সুফল বনায়নের কন্ট্রাকটার আইটেম বাগানের নার্সারির বাঁশ, গোবর, সার, পলিব্যাগ, মাটি, সুতলি, খুঁটি, সাইনবোর্ড তাদের লোক দিয়ে টেন্ডার করিয়ে ঠিকাদারদের নামে মাত্র কিছু টাকা দিয়ে বাকি টাকা ফরেস্টারদের মাধ্যমে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের সাবেক ডিএফও সরওয়ার আলম আত্মসাৎ করে নিত। তার সিংহভাগ নিত বিপুল কৃষ্ণ দাস। জোয়ারিয়ানালা, উখিয়া, তুলাতলি বনভূমিতে সরেজমিনে দেখা গেছে, সুফল প্রকল্পের এসব বাগানে গাছ না থাকলেও দেখা গেছে সাইনবোর্ড।

সাইনবোর্ডে বাগান সৃজনে চারার সংখ্যা ও গাছের প্রজাতির কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। আবার কোন জায়গায় বাগানের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চারার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া যে চারাগুলো লাগানো হয়েছে, অনেক গাছের চারা প্রথম বছরেই মারা গেছে। চারা রোপনের পরের বছর সার দেওয়ার কথা এখানে কোথাও দেওয়া হয়নি।

সঠিক পরিচর্যার অভাবে মারা গেছে অধিকাংশ চারা। কেবল সুফল প্রকল্প নয়, অর্থের বিনিময়ে বনাঞ্চলে অবৈধ বসতি স্থাপন, পাহাড় নিধন, বালি উত্তোলনসহ নানাভাবে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তাই পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রথম বছরেই মারা গেছে ৪০ শতাংশ চারা। দ্বিতীয় বছরে কম্পোস্ট সার দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। পরিচর্যার অভাবে দ্বিতীয় বছরেও মারা গেছে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ চারা। বনায়নের চিকরাশি, গামার, আকাশমনি, চাতিয়া, করই, বহেরা, অর্জুন গাছ লাগানোর নির্দেশনা থাকলেও তা যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি।

অপরদিকে সাড়ে ৬ ফুট অন্তর চারা রোপণের কথা থাকলেও একেকটি চারার দূরত্ব করা হয়েছে ১০ থেকে ১২ ফুট। চারা রোপণের আগে গোবর সার ও রাসায়নিক সার দেয়ার কথা থাকলেও তা দেয়া হয়নি। উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার এসব পাহাড়ে দেখা মেলতো বিভিন্ন প্রজাতির পশু পাখি। শোনা যেতো পাখির কোলাহল। কিন্তু বন দখল, পাহাড় কাটা ও বনায়নের নামে বিশ্ব ব্যাংকের ঋণের কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে লুটপাটের ফলে বেহাত হয়ে গেছে সিংহ ভাগ বনভুমি। উল্লেখ্য, দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ২৫ শতাংশ বনভূমি প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে সরকারি বনজ সম্পদ উন্নয়নে ২০১৮ সালে টেকসই বন ও জীবিকা শীর্ষক সুফল প্রকল্প গ্রহণ করে বন অধিদফতর।

প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বন মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় প্রকল্প মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে পদে পদে ঘটেছে দুর্নীতি। এমন অভিযোগে সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বন ভবনে অভিযানে যায় দুদক। সংস্থাটির অভিযোগে বলা হয়েছে, সুফল প্রকল্প, বনায়ন প্রকল্প কিংবা রাজস্ব খাতের বরাদ্দের টাকা কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। যা গোয়েন্দা তথ্যে প্রমাণ পেয়েছে দুদক। একইভাবে সিন্ডিকেটে পোস্টিং বাণিজ্যের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন শত শত কোটি টাকা। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষণ বিপুল কৃষ্ণ দাসসহ অনেকে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে বলে জানিয়েছেন দুদক। ওই সময়ের চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক বিপুল কৃষ্ণ দাস ও কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের ডিএফও সারওয়ার আলম সুফল বনায়নের লুটপাট ফরেস্টারদের দিয়ে করিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

গত ৫ আগস্টের পর বিপুল কৃষ্ণ দাসের সিন্ডিকেটের মাঠ পর্যায়ের টাকা উত্তোলনকারি বহাল তবিয়তে রয়েছে কামরুজ্জামান শোভন ও ফছিউল আলম শুভ। ডিএফও সরওয়ার আলমের সীমাহীন দূর্নীতির কারণে চাকরি শেষ হওয়ার এক বছর আগে অবসর নিয়েছেন বলে গুঞ্জণ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, বিপুল কৃষ্ণ দাশ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক থাকাকালীন যারা তার ইচ্ছা পূরণ করে সেসব বন কর্মকর্তা / কর্মচারীদেরকে তিনি লোভনীয় বন বিভাগে বদলি, আর যারা তার ইচ্ছা পূরণ করতে পারতেন না তাদের কম লোভনীয় বন বিভাগে বদলি করতেন। এক্ষেত্রে তিনি চেইদ্যা বিট কর্মকর্তা ফছিউল আলম শুভ ও লিংক রোড স্টেশন কর্মকর্তা কামরুজ্জামান শোভনের মধ্যস্থতা ও বিনিময়ে কাজগুলো করতেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ফরেস্টার ও বন প্রহরীদের নিকট থেকে জানা যায়। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল কৃষ্ণ দাসের আমলে বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট সবচেয়ে বেশি গাছ নিধন করা হয়েছে।

কক্সবাজার উত্তরের ফাঁসিয়াখালী, মেহেরঘানা, দক্ষিণের কাগজে কলমে সুফল বনায়ন দেখিয়ে বনভূমিকে ধ্বংস করে কোটি কোটি টাকা দূর্নীতি করেছে বিপুল কৃষ্ণ দাসের সিন্ডিকেট। নাম না প্রকাশ না করার শর্তে কিছু বন রক্ষক ও বনপ্রহরী বলেন যে, সুফল প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম বন অঞ্চলের যেসব বন বিভাগে বাগান সৃজন হয়েছে এবং হচ্ছে এসব বাগান যদি যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই বাছাই করা হয় অনেক গড়মিল ও অনিয়ম ধরা পড়বে।বন বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দাবি, সাবেক চট্টগ্রাম বন অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত বন সংরক্ষক বিপুল কৃষ্ণ দাসের অবৈধ কাঠ উদ্ধারে নীরবতা, বদলি নিয়োগে অনিয়ম, সাঙ্গু মাতামুহুরী রির্জার্ভ ফরেস্ট ধ্বংসের দায় দায়িত্বের বিষয়ে এবং সুফল প্রকল্পের ব্যাপারে নিরপেক্ষ উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে যথাযথ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হোক।বিপুল কৃষ্ণ দাস বর্তমানে গাজীপুর ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারে পরিচালক পদে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে। এবিষয়ে জানতে প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধুরীকে একাধিকবার কল দিলে রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

- Advertisement -
newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *