২৬ বছরে ২৫ বার চীন সফর, পুতিনের কূটনীতিতে ব্যতিক্রমী ঘনিষ্ঠতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

4 Min Read

ভ্লাদিমির পুতিনের শুরু হওয়া চীন সফর কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক কর্মসূচি নয় বরং এটি গত প্রায় দুই দশকের বিশ্ব রাজনীতির এক ধারাবাহিক পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। তাঁর ২৫তম চীন সফরকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা আসলে চীন–রাশিয়া সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত রূপান্তরকেই সামনে আনে।

পুতিনের ২৬ বছরে ২৫ বার চীন সফরকে শুধু ঘন ঘন কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটা ধরা পড়ে না। এটি আসলে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক কৌশলের ফল, যেখানে রাশিয়া ও চীন একে অপরকে পশ্চিমা-কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখেছে।

যার প্রথম কারণ হলো ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, আর চীন দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। পুতিন বুঝতে পারেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রাশিয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ধীরে ধীরে ইস্টার্ন শিফট বা পূর্বমুখী কৌশল গ্রহণ করা হয়, যার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে চীন।

দ্বিতীয় কারণ হলো নিরাপত্তা ও কৌশলগত জোট গঠন। ন্যাটো সম্প্রসারণ, ইউক্রেন সংকট এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার জন্য চীন হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সঙ্গী। দুই দেশই পশ্চিমা প্রভাব কমাতে একটি বিকল্প শক্তি ভারসাম্য তৈরি করতে চায়।

তৃতীয় কারণ হলো অর্থনীতি ও জ্বালানি নির্ভরতা। রাশিয়ার বিশাল জ্বালানি সম্পদ (তেল ও গ্যাস) চীনের ক্রমবর্ধমান শিল্প ও বিদ্যুৎ চাহিদার সঙ্গে মিলে যায়। পাইপলাইন, দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস চুক্তি এবং ইউয়ান-রুবল লেনদেন সবই এই সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।

চতুর্থ কারণ হলো নেতৃত্ব পর্যায়ের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক সম্পর্ক। পুতিন ও শি জিনপিংয়ের সম্পর্ককে বিশ্লেষকরা অস্বাভাবিকভাবে ঘনিষ্ঠ বলে উল্লেখ করেন। দুই নেতা একে অপরকে ৪০ বারের বেশি বৈঠকে মিলেছেন, যা কৌশলগত আস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

পঞ্চম কারণ হলো আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলা। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ক্রিমিয়া সংকট এবং ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেই শূন্যতা পূরণে চীন হয়ে ওঠে প্রধান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক লাইফলাইন।

পুতিন প্রথম চীন সফর করেন ২০০০ সালের জুলাই মাসে তখন তিনি সদ্য রাশিয়ার ক্ষমতায় আসেন। সেই সময় রাশিয়া অর্থনৈতিক সংকট ও সোভিয়েত পরবর্তী পুনর্গঠনের ধাপে ছিল, আর চীন ছিল দ্রুত উত্থানশীল অর্থনৈতিক শক্তি। শুরু থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্ব হিসেবে এগোতে থাকে। ২০০১ সালে স্বাক্ষরিত ‘সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’ এই সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়, যা পরবর্তী দুই দশকে আরও গভীর হয়।

এই দীর্ঘ সময়ে পুতিন চীন সফর করেছেন অন্তত ২৫ বার, যা তাঁর বিদেশ সফরের তালিকায় অন্যতম সর্বোচ্চ। তবে শুধু চীন নয়, পুতিনের অন্যান্য প্রধান অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে যেমন ভারত, জার্মানি (আগের ইউরোপীয় সম্পর্ক পর্যায়ে), বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সেখানে সফরের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম এবং ছড়ানো-ছিটানো।

- Advertisement -

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি সেখানে চীন সফরের মতো এত ঘন ঘন যাননি। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিম ইউরোপে তাঁর সফর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে কমে এসেছে। ফলে চীনই একমাত্র দেশ, যেখানে তাঁর সফরের ধারাবাহিকতা সবচেয়ে বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ২৫টি সফর শুধু সংখ্যার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এর প্রতিটি ধাপই চীন–রাশিয়া সম্পর্কের পরিবর্তিত সমীকরণের অংশ। শুরুতে এটি ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা, পরে জ্বালানি ও সামরিক অংশীদারত্ব, এবং এখন এটি কৌশলগত জোটের রূপ নিচ্ছে, যেখানে পশ্চিমা বিশ্বকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিপরীতে একটি বিকল্প শক্তি ব্লক গড়ে উঠছে।

পুতিনের সাম্প্রতিক সফরগুলোতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সহযোগিতা। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল মুদ্রা এবং বিকল্প বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো নিয়ে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে—যা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ডলারের প্রভাব কমানোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ বলে মনে করা হয়।

- Advertisement -

সব মিলিয়ে, পুতিনের ২৫তম চীন সফর কেবল একটি কূটনৈতিক সফর নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রবণতার প্রতিফলন, যেখানে চীন এখন রাশিয়ার সবচেয়ে স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য কৌশলগত অংশীদারে পরিণত হয়েছে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *