২৮ জুলাই বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য প্রবাদপুরুষ, নির্ভীক চিন্তক এবং আপসহীন বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফার প্রয়াণদিবস। সময়ের হিসাবে তিনি আমাদের ছেড়ে গেছেন বহু বছর আগে, কিন্তু তাঁর চিন্তা, দর্শন এবং লেখনী আজও আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। তাই আহমদ ছফাকে স্মরণ করা নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মুক্তবুদ্ধি, সত্যনিষ্ঠা এবং আত্মসমালোচনার চর্চাকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি প্রয়োজনীয় উপলক্ষ।
বাংলা সাহিত্যে আহমদ ছফা ছিলেন এক ব্যতিক্রমী উপস্থিতি। তিনি কোনো মতাদর্শের অন্ধ অনুসারী ছিলেন না, আবার ক্ষমতারও অনুগত ছিলেন না। সত্যকে তিনি দেখেছেন নিজের বিবেকের আলোয়, আর সেই সত্যকে উচ্চারণ করেছেন নির্ভয়ে। তাঁর কলম কখনো রাষ্ট্রের অসংগতি, কখনো সমাজের ভণ্ডামি, কখনো বুদ্ধিজীবীদের আত্মবিস্মৃতি, আবার কখনো জাতিসত্তার সংকটকে নির্মোহ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে।
আহমদ ছফার সাহিত্যকর্মের বিশেষত্ব এখানেই যে, তাঁর রচনা শুধু পাঠের আনন্দ দেয় না; পাঠককে অস্বস্তিতেও ফেলে। কারণ তিনি প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন, আত্মসমালোচনার সাহস জুগিয়েছেন এবং প্রচলিত বিশ্বাসকে যুক্তির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। বাঙালি মুসলমানের মন আমাদের জাতিসত্তার ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এক অসাধারণ দলিল। যদ্যপি আমার গুরু শুধু স্মৃতিকথা নয়; এটি একটি সময়, একটি সাহিত্যজগত এবং মানবিক সম্পর্কের গভীর দলিল। আর অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী কিংবা ওঙ্কার প্রমাণ করে, তিনি কেবল প্রাবন্ধিক নন, শক্তিশালী কথাসাহিত্যিকও ছিলেন।
আজকের বাংলাদেশে আহমদ ছফাকে নতুন করে পাঠ করার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কারণ আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি, যখন মতের ভিন্নতা প্রায়ই বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যুক্তির পরিবর্তে আবেগ এবং তথ্যের পরিবর্তে প্রচারণা সমাজকে প্রভাবিত করে। এই বাস্তবতায় আহমদ ছফার মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ এবং আত্মসমালোচনার শিক্ষা আমাদের জন্য এক মূল্যবান দিকনির্দেশনা।
আহমদ ছফা বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার স্বাধীন চিন্তার চর্চায়। তিনি তরুণদের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন, প্রশ্নহীন সমাজ কখনো অগ্রসর হতে পারে না। তাঁর জীবন ছিল সহজ, কিন্তু চিন্তার পরিসর ছিল অসীম। ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চেয়ে তিনি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই কারণেই তিনি আজও কেবল একজন লেখক নন; তিনি একটি বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের প্রতীক।
কালের প্রবাহে অনেক লেখকের নাম স্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যায়। কিন্তু আহমদ ছফা তাঁদের একজন নন। যতদিন বাংলা ভাষা, সাহিত্য, মুক্তচিন্তা এবং সত্য উচ্চারণের সাহস বেঁচে থাকবে, ততদিন তাঁর রচনাও নতুন প্রজন্মকে আলো দেখাবে। তাঁর লেখা আমাদের শেখায়—জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে সত্যনিষ্ঠ হওয়া বড়, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার চেয়ে বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকা শ্রেয়।
আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে আমাদের শ্রদ্ধা তখনই অর্থবহ হবে, যখন আমরা তাঁর বইগুলো নতুন করে পড়ব, তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হব এবং একটি যুক্তিবাদী, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণে নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হব। আহমদ ছফার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা ফুলেল আনুষ্ঠানিকতায় নয়; তাঁর চিন্তার উত্তরাধিকারকে জীবন্ত রাখার মধ্যেই নিহিত।
আহমদ ছফা নেই, কিন্তু তাঁর উচ্চারিত সত্য আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। এই অমোঘ উপস্থিতিই একজন সত্যিকারের মনীষীর অমরত্ব। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
