যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগে গত এক বছর ধরে পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল নীরব ও সীমিত। মূলত বার্তা আদান-প্রদান ও যোগাযোগের পথ খোলা রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল ইসলামাবাদের কার্যক্রম। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেই ভূমিকার পরিবর্তন ঘটেছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করার পর পাকিস্তান কেবল বার্তাবাহক না থেকে আলোচনার আয়োজনকারী ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে আসতে শুরু করে। ইসলামাবাদে বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানানো এবং সরাসরি আলোচনার আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও দৃশ্যমান করে তোলে দেশটি।
গত ২৪ মার্চ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সংলাপ সহজতর করার কথা বলেন। এর এক সপ্তাহ পর উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানান, পাকিস্তান শুধু সহায়তা নয়, অর্থবহ আলোচনার আয়োজনও করবে। পরে এপ্রিলের মাঝামাঝি তিনি আরও এগিয়ে গিয়ে বলেন, একাধিক দফায় ‘গুরুত্বপূর্ণ ও গঠনমূলক’ আলোচনায় পাকিস্তান সরাসরি মধ্যস্থতা করেছে।
কেন পাকিস্তান?
বিশ্লেষকদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থান পাকিস্তানকে একটি সুবিধাজনক জায়গায় নিয়ে এসেছে। দেশটি একদিকে ইরানের প্রতিবেশী, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে। তবে শুধু ভৌগোলিক সুবিধা নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানোর কৌশল হিসেবেও এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে।
কূটনৈতিক মহলে ধারণা, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতেও পাকিস্তান সক্রিয় ভূমিকা নিতে আগ্রহী হয়েছে। একই সঙ্গে অতীত অভিজ্ঞতাও তাদের এই ভূমিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহ জুগিয়েছে।
সাবেক পররাষ্ট্রসচিব জালিল আব্বাস জিলানি বলেন, অতীতে ইরানে আটক মার্কিন নাগরিকদের মুক্তি ও অন্যান্য ইস্যুতেও পাকিস্তান ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক সংঘাত এবং পরবর্তীতে আঞ্চলিক বিভিন্ন সংকটে যোগাযোগ স্থাপনে পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল।
মধ্যস্থতার চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর মধ্যস্থতার জন্য নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক কূটনীতিক মালিহা লোধি মনে করেন, দুই পক্ষের আস্থা অর্জন না করলে কোনো মধ্যস্থতাই সফল হয় না।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংকটে একদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি ও সামুদ্রিক প্রবেশাধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চায় ইরান। ফলে উভয় পক্ষের চাহিদা পূরণ না হলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এছাড়া আলোচনার কাঠামো ও প্রক্রিয়া ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি বা ডেটন অ্যাকর্ডস দেখিয়েছে, সফল চুক্তির জন্য শক্তিশালী কাঠামো, আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থার প্রয়োজন।
সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের বড় শক্তি হচ্ছে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সক্ষমতা। তবে ‘যোগাযোগ’ সবসময় ‘প্রভাব’ তৈরি করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব ও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার বাস্তবতায় ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে ওঠে।
সাবেক কূটনীতিক মাসুদ খান বলেন, পাকিস্তান অতীতের কোনো নেতিবাচক বোঝা বহন করছে না এবং এটি একটি নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
তবে পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলছেন, আলোচনায় গতি থাকলেও শক্তিশালী কাঠামো না থাকলে তা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক ইস্যু ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা, এই জটিল বিষয়গুলো সমাধান ছাড়া কোনো সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
জাতিসংঘ থেকে শুরু করে রাশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশ পাকিস্তানের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল উদ্যোগ নয় কার্যকর কাঠামো, ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততাই নির্ধারণ করবে এই মধ্যস্থতার সাফল্য।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংকটে পাকিস্তান নতুনভাবে কূটনৈতিক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে। তবে এই প্রচেষ্টা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করছে আলোচনার ধরন, আস্থা তৈরি এবং বাস্তবসম্মত সমাধান কাঠামোর ওপর।
