যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত এবং বাণিজ্যপথে অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্বজুড়ে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় এই প্রভাব আরও তীব্র হয়েছে।
ব্যবসা খাতে চাপ বাড়ছে
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় ও কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে চাপে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের আর্থিক পূর্বাভাস কমিয়েছে বা স্থগিত করেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বহু কোম্পানি ইতোমধ্যে পণ্যের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টিই কানেক্টিভিটি জানিয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাড়তি পরিবহন ব্যয় ও কাঁচামালের খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপানো ছাড়া উপায় থাকবে না। একইভাবে থ্রিএম সতর্ক করেছে যে জ্বালানির দাম বাড়লে তাদের পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
ব্রিটিশ ভোগ্যপণ্য নির্মাতা রেকিট জানিয়েছে, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে তাদের মুনাফা কমে যেতে পারে।
ভ্রমণ ও বিমান খাতে বড় ধাক্কা
যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে পর্যটন ও বিমান পরিবহন খাতে। জার্মান পর্যটন প্রতিষ্ঠান টিইউআই তাদের বার্ষিক আয়ের পূর্বাভাস কমিয়েছে এবং অনিশ্চয়তার কারণে ভবিষ্যৎ নির্দেশনা স্থগিত করেছে।
ইউনাইটেড এয়ারলাইনস জানিয়েছে, জ্বালানি খরচ বাড়ায় তাদের প্রত্যাশিত মুনাফা কমে যেতে পারে। অপরদিকে লুফথানসা অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইট কমানোর পরিকল্পনা করছে, কারণ জেট জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে।
সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন
যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। ফরাসি খাদ্য প্রতিষ্ঠান ড্যানোন জানিয়েছে, শিশু খাদ্য সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে, যা কিছু বাজারে সাময়িক সংকট বা মূল্য বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
লিফট নির্মাতা ওটিস-ও জানিয়েছে, পরিবহন সমস্যা ও শুল্কের কারণে তাদের পণ্য সরবরাহ বিলম্বিত হচ্ছে।
বিশ্বের বৃহত্তম কনডম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কারেক্স বেরহাদ জানিয়েছে, কৃত্রিম রাবার, প্যাকেজিং ও লুব্রিক্যান্টের দাম বাড়ায় তাদের পণ্যের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনে সময় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
রং প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আকজো নোবেল জানিয়েছে, তেলভিত্তিক কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তাদের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা পণ্যের দাম বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিকল্প বাণিজ্যপথে চাপ ও খরচ বৃদ্ধি
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জাহাজগুলো বিকল্প রুট ব্যবহার করছে, ফলে নতুন বাণিজ্যপথগুলোতে চাপ বাড়ছে। পানামা খালে জাহাজ চলাচলের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে জাহাজ পারাপারের জন্য দশ লাখ ডলারেরও বেশি খরচে স্লট কেনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
একই সময়ে মালাক্কা প্রণালির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। প্রতিদিন ২ কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথে পরিণত করেছে।
ভোক্তাদের ওপর সরাসরি প্রভাব
যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ছে। জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে এবং সতর্ক করেছে যে পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে অর্থনীতি আরও খারাপ হতে পারে। ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, ইউরোপীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।
বিমান ভাড়া বেড়েছে, জ্বালানি সারচার্জ যুক্ত হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ফ্লাইট সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে ভ্রমণ ব্যয়বহুল ও সীমিত হয়ে পড়েছে।
বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝোঁক
উচ্চ জ্বালানি দামের কারণে ইউরোপে ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ বিল কমাতে এবং আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প খুঁজছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে মানুষ ভ্রমণ কমাচ্ছে এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন বা ভাড়ার বিকল্প ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে।
