সাভারে মাত্রা ছাড়িয়েছে বায়ুদূষণ, ঝুঁকিতে এলাকার জনস্বাস্থ্য-অর্থনীতি

সাভারের বিভিন্ন এলাকার পানি পরীক্ষা করে মোট ৫০টি নমুনার মধ্যে ৮টি পানির উেস রোটা ভাইরাসের জিবাণু পাওয়া গেছে। গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে সাভার অঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত। এই ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত বিপজ্জজনক এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

মনির মন্ডল, সাভার:

7 Min Read

সাভারে দূষণে ধুঁকছে, ঝুঁকিতে ৪০ লাখ মানুষ রাজধানীর অদূরে সাভার উপশহরসহ এর চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলো আজ চরম দূষণের কবলে। কল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে এখানে যেন বিশুদ্ধ বাতাস নেই। নদীর পানিতে যেন বিষ। সাভারের বায়ুর নিম্নমুখী অবস্থানে দুশ্চিন্তায় এলাকার নাগরিক সমাজ। আশঙ্কা, পরিবেশের এমন পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্যের ওপরই নয়, নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এখানকার জনগোষ্ঠীর সার্বিক স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশ আজ বিপন্ন। এ থেকে উত্তরণে দূষণ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ।

সাভার উপজেলা মারাত্মক বায়ুদূষণ আক্রান্ত অঞ্চল হিসেবে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

গবেষণা বলছে, সাভারের বায়ুদূষণের জন্য অবৈধ ইটভাটা দায়ী ২৮ শতাংশ। আইকিউ এয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৫০ স্কোর পর্যন্ত বায়ুর মান ভালো বলে বিবেচিত হলেও সাভারে তা ৮৫ এর ওপর থাকে বছরের বেশিরভাগ সময়ই।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাভারে ১০৭টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র দুটি ভাটায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। শুষ্ক মৌসুমে এখানকার দূষিত বাতাস ঢাকায় প্রবাহিত হয়ে ঘনবসতিপূর্ণ জনজীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলে। এসবের জেরেই সাভার অঞ্চলকে “ডিগ্রেডেড এয়ারশেড” ঘোষণা করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. কামরুজ্জামান এনডিসি স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে এই ঘোষণা জারি করা হয়। অধিদপ্তরের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য মতে, সাভারের বাতাসে দূষণমাত্রা জাতীয় মানের প্রায় তিনগুণ বেশি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, শুষ্ক মৌসুমে প্রায় পাঁচ মাস ধরে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু সাভারের দূষিত ধূলিকণা ও ধোঁয়া রাজধানী ঢাকায় ছড়িয়ে দেয়। ফলে শুধু সাভারের জনগণই নয়, ঢাকার কোটি মানুষের শ্বাসযন্ত্রও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে।

পরিপত্রে বলা হয়েছে, এই ঘোষণা কার্যকর হওয়ার পর থেকে সাভারের সব ইটভাটা (টানেল ও হাইব্রিড হফম্যান কিলন ছাড়া) ইট পোড়াতে পারবে না। উন্মুক্ত জায়গায় কঠিন বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ থাকবে। পাশাপাশি নতুন কোনো শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্রও দেওয়া হবে না, যদি সেটি বায়ুদূষণ সৃষ্টি করে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের গবেষকরা গত তিন বছর ধরে সাভারে পরিবেশ ও পানি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সাভারের বিভিন্ন এলাকার পানি পরীক্ষা করে মোট ৫০টি নমুনার মধ্যে ৮টি পানির উেস রোটা ভাইরাসের জিবাণু পাওয়া গেছে। গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে সাভার অঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত। এই ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত বিপজ্জজনক এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শুভ কান্তি দে জানান, সাভার অঞ্চলে নদী ও খাল ভরাট, শিল্পকারখানার দূষণ এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে।

- Advertisement -

নির্গত শিল্প বর্জ্যের কারণে নদী জলাশয়গুলো মারাত্মকভাবে দূষণের কারণে ৪০ লাখ জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এ জনপদের অধিকাংশ মানুষ বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত। এছাড়াও ইটভাটার ও যানবাহনের কালো ধোঁয়া এলাকার পরিবেশ বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দূষণ প্রক্রিয়া অব্যাহতভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সেই সঙ্গে জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়বে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণার তথ্য থেকে জানা যায়, প্রতিদিন দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনমিটার গৃহস্থালি বর্জ্যের বিপরীতে প্রায় ৭ হাজার শিল্প ইউনিট থেকে নির্গত ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘটমিটার শিল্পবর্জ্য মূলতঃ খাল, নদী জলাশয় দূষণের জন্য শতকরা ৬০ ভাগ দায়ী।

রাজধানীর চারপাশে তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, বংশী, ধলেশ্বরী, শীতালক্ষ্যা, বালু নদের প্রায় ১১০ কিলোমিটার আজ দুর্বিষহ দূষণের শিকার। এসব নদীর তীরে গড়ে উঠেছে অনেক মিল-কারখানা। এসব নদীতে ব্যাপকভাবে শিল্প বর্জ্য ফেলার কারণে পানি আজ দূষিত হতে হতে বিষময় হয়ে পড়েছে। ডাইং ইউনিটগুলোতে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালু না হওয়ায় লাখ লাখ মানুষ পরিবেশ দূষণের শিকার হয়ে জন্ডিস, ডায়রিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, মূত্রনালী ও কিডনিজনিত রোগ, চর্মরোগসহ ক্যানসারের মতো ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। বর্জ্যের বিষক্রিয়ায় আবাদি জমির ফসলের ফলনও অনেক কমে গেছে।

- Advertisement -

ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ (ডিইপিজেড) সাভার উপজেলার শতাধিক টেক্সটাইল মিল ও ডাইং কারখানা থেকে রাসায়নিক মিশ্রিত গাঢ় কালো ও বেগুনী দূষিত তরল পদার্থ বর্জ্য অবাধে সরাসরি নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। আর তা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। দূষিত তরল শিল্প বর্জ্যে ফলদ বৃক্ষের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। ফলের উত্পাদন হ্রাসসহ পণ্যের আকারও ছোট হয়ে যাচ্ছে। ডিইপিজেডের পাশ দিয়ে বহমান ধলাই বিলের মাছের খ্যাতি ছিল। কিন্তু মিল-কারখানার বর্জ্যে বিষাক্ত হয়ে ধলাই বিলের অনেক মাছ মরে ভেসে উঠছে। এমনকি সাভারের বিভিন্ন খাল ও নদীর মাছ রান্না করলে তাতে কেরোসিনের গন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে সাভার উপজেলায় গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক ইটের ভাটা। ইটভাটার নির্গত ধোঁয়ায় এলাকা সবসময় ধোঁয়াচ্ছন্ন থাকে। ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো নিষিদ্ধ থাকলেও আইনকে তোয়াক্কা না করে ইটভাটার মালিকরা কাঠ পোড়ানোর পাশাপাশি গাড়ির টায়ার, পোড়া মবিল, পলিথিন ও রাবার জাতীয় দ্রব্যাদি পোড়ানোর কারণে পরিবেশ চরমভাবে দূষিত হয়ে পড়ছে। আবাসিক এলাকায় ইটভাটা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকলেও খোদ সাভারের ভিতর একাধিক ইটভাটা গড়ে উঠেছে। ইটভাটার ধোঁয়ায় ছাত্রছাত্রীদের মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে। এলাকাবাসীর এমন হাঁপানি, হৃদরোগ, চর্মরোগসহ বায়ুদূষণজনিত বিভিন্ন রোগব্যাধি দেখা দিয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ আমজাদুল হক বলেন, যানবাহন থেকে শুরু করে ইটভাটার কালো ধোঁয়া শিশুদের মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য অবশ্যই দূষণমুক্ত পরিবেশ আবশ্যক।

সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ সালাহ উদ্দিন খান নাঈম বলেন,পরিবেশ অধিদপ্তর যে উদ্যোগ নিয়েছে, আমরা এটিকে স্বাগত জানাই। মানুষের স্বাস্থ্যের যে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, আমরা দীর্ঘদিন ধরে সেটি নিয়ে কথা বলেছি। আমাদের নদী-নালা, খাল বিল পরিবেশ যেভাবে দূষিত হয়েছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আমরা এখানে বসবাস করতে পারবো না। এগুলো আমরা বারবার বলেছি। সরকার যে ব্যবস্থা নিয়েছে, শুধু কাগজপত্রে যাতে সেটি সীমাবদ্ধ না থাকে। অবস্থা থেকে বেরিয়ে বাসযোগ্য সাভার গড়তে যা যা প্রয়োজন, সরকার সেগুলো করতে পিছপা হবে না। সাভারের প্রাণ প্রকৃতি ফিরিয়ে আনবে সেটিই আমরা চাই।

এসব বিষয়ে সাভারের পরিবেশ আন্দোলনের নেতা অধ্যাপক দীপক কুমার রায় বলেন, কল-কারখানার বর্জ্য দূষণ অব্যাহত থাকলে রাজধানীসহ আশপাশের কয়েকটি অঞ্চল আগামী কয়েক বছরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে বলে মনে করে তিনি।

এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আবু বকর সরকার বলেন, ‘‘আমরা গত অবৈধ ইটভাটার ৩২টি চিমনি ভেঙে দিয়েছি। অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অসংখ্য সীসা কারখানা, ব্যাটারি কারখানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখনও চলমান। তথ্য পাওয়া মাত্রই সেগুলো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাভারকে যেহেতু ডিগ্রেডেড এয়ার শেড ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে বায়ু দূষণে ভূমিকা রাখা যেসব অবৈধ ইটভাটা, ব্যাটারি কারখানা, সীসা কারখানা রয়েছে সেগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হবে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *