দেশের অর্ধেকের বেশি জেলায় এখনো নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) নেই। ফলে রাজধানীর বাইরে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সময়মতো সংকটাপন্ন চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বিদ্যমান আইসিইউ–সুবিধার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক। এই বৈষম্য দূর করতে জেলা পর্যায়ে আইসিইউ সেবা সম্প্রসারণ এবং সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগ চালুর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের (বিএসসিসিএম) জাতীয় সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৮ জেলায় কোনো আইসিইউ সেবা নেই। বর্তমানে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য ক্রিটিক্যাল কেয়ার শয্যা রয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭টি। আর সাধারণ হাসপাতালের শয্যা রয়েছে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মাত্র ৯টি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, দেশের ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করলেও অধিকাংশ ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট বড় শহরকেন্দ্রিক। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি বলেন, নবজাতক, অন্তঃসত্ত্বা নারী, নিউমোনিয়া ও স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী কিংবা সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো আইসিইউ সেবা না পাওয়ায় ঝুঁকি বাড়ছে। রাজধানীর বাইরে এ সেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। তিনি জানান, চলতি মাস থেকেই হাসপাতালে আনসার সদস্য নিয়োগ শুরু হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের ২০ জেলায় নতুন আইসিইউ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য খাত এ বছর গত ৫৬ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট পেয়েছে। এরই অংশ হিসেবে প্রায় ২০টি সরকারি হাসপাতালে নতুন আইসিইউ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন ও অ্যানেস্থেসিওলজি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একে অন্যের পরিপূরক। দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগ চালুর দাবির প্রতিও তিনি সমর্থন জানান।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ. এম. সিদ্দিকী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন একটি স্বতন্ত্র বিশেষায়িত শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশেও এ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা সম্প্রসারণের উদ্যোগ চলছে।
সম্মেলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এএসএম আরিফ আহসান বলেন, দেশে ক্রিটিক্যাল কেয়ার চিকিৎসার মানোন্নয়নে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জন্সে (বিসিপিএস) এফসিপিএস (ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন) কোর্স চালুর সময় এসেছে।
সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চিকিৎসা, প্রিসিশন মেডিসিন, এআরডিএস, ইসিএমও, সেপসিস ব্যবস্থাপনা ও আইসিইউ ডেলিরিয়ামসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঁচটি বৈজ্ঞানিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী অধিবেশনে বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক মানের ক্রিটিক্যাল কেয়ার সেবা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
