বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মির্জা আব্বাস অসুস্থ হয়ে রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে তাকে দেখতে হাসপাতালে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি মির্জা আব্বাসের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং কিছু সময় হাসপাতালের শয্যার পাশে অবস্থান করে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী মির্জা আব্বাসকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত সিঙ্গাপুরে পাঠানোর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার ইফতারের সময় হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মির্জা আব্বাস। পরে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।
প্রারম্ভিক ও পারিবারিক জীবন
আব্বাস উদ্দিন আহমেদ যিনি মির্জা আব্বাস নামে অধিক পরিচিত, ১৯৫১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম আব্দুর রাজ্জাক এবং মাতার নাম কমলা খাতুন। কিশোরগঞ্জে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি নারায়ণগঞ্জের বন্দরের মদনপুরে অবস্থিত নাজিমউদ্দিন ভূঁইয়া ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৭১ সালে বাণিজ্য বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৩ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি আফরোজা আব্বাসকে বিয়ে করেন। আফরোজা আব্বাস বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি। এই দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
ব্যবসা ও সামাজিক উদ্যোগ
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে তিনি পারিবারিক ব্যবসা ‘মির্জা এন্টারপ্রাইজ’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৯৫ সালে মির্জা আব্বাসকে ঢাকা ব্যাংকের বিকল্প পরিচালক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এবং একই বছরের ২৯ মার্চ ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান।
নারী শিক্ষার প্রসারে তিনি ১৯৮০ সালে ঢাকার শাহজাহানপুরে নিজের নামে মির্জা আব্বাস মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
রাজনৈতিক জীবন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে চার দশকের বেশি সময় ধরে সক্রিয় এক পরিচিত নাম মির্জা আব্বাস। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। মেয়র, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করা এই প্রবীণ রাজনীতিকের রাজনৈতিক জীবন উত্থান-পতন, আন্দোলন, ক্ষমতা ও আইনি লড়াইয়ের নানা অধ্যায়ে সমৃদ্ধ।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার পর মির্জা আব্বাস দলটিতে যোগ দেন। দ্রুতই তিনি ঢাকার রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৮০-এর দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর বিরুদ্ধে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানেও সংগঠক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৬ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সালের ১৯ মে তাকে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৯৪ সালে ঢাকার প্রথম সরাসরি মেয়র নির্বাচনে অংশ নিলেও সেখানে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফ-এর কাছে পরাজিত হন।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য ভূমি মন্ত্রী এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরী-এর কাছে পরাজিত হন।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের ১১ অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
মন্ত্রী হিসেবে তিনি পরিবেশগত ভারসাম্য ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে জলাভূমি সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর জোর দেন। তার নেতৃত্বে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা সংশোধন করে, যা ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে প্রণীত হয়।
এছাড়া তার পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারি গৃহায়ন ভূমি উন্নয়ন বিধিমালাও প্রণয়ন করা হয়, যা রিয়েল এস্টেট খাতে জলাভূমি ও বন্যা প্রবাহ অঞ্চল ভরাটের মতো কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণে নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে।
আইনি জটিলতার কারণে তিনি ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় তিনিও অংশ নেননি। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।
২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে দলের প্রতি অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত করা হয়। পরে ২০১৪ সালে তাকে বিএনপির ঢাকা শহর ইউনিটের আহ্বায়ক করা হয়।
২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে মির্জা আব্বাস ও নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জনসভা ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও সমালোচনা করেন, যা গণমাধ্যম ও জনমনে ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির নেতা নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীকে পরাজিত করে ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং সংসদে ফিরে আসেন, এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান।
আইনি জটিলতা ও কারাবাস
২০০৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সম্পদের বিবরণী জমা দিতে গেলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি তখন দুদকের প্রকাশিত দুর্নীতির সন্দেহভাজনদের প্রথম তালিকার একজন ছিলেন। ২০০৭ সালের ১৫ জুলাই দুদক তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০০৬ সালে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় একটি শিল্প প্লট অবৈধভাবে বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনায় তিনি জড়িত ছিলেন।
২০০৮ সালের ১২ মে তাকে আয়কর ফাঁকি ও কর রিটার্নে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে আট বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে ২০১৪ সালের ৬ মার্চ সাংবাদিকদের মধ্যে প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আরেকটি দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়। তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিনি ২০১৬ সালের এপ্রিলে জামিনে মুক্তি পান এবং ২০২৫ সালে আদালত তাকে ওই মামলা থেকে খালাস দেন।
২০১৬ সালের ৬ জানুয়ারি আত্মসমর্পণের পর তাকে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে দায়ের করা দুটি সহিংসতার মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর তিনি ২০২৪ সালে কারামুক্ত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে মির্জা আব্বাসের অধিকাংশ মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত।
মেয়র, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং দলীয় নীতিনির্ধারক বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে মির্জা আব্বাস বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
