৮ মাসে এক ঠিকাদারের ২৮০ কাজ, ইজিপি কি শুধুই ফর্মালিটি?

বিশেষ প্রতিনিধি :

5 Min Read

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পিরোজপুরে ঠিকাদারি কাজ দখলে নিতে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিল চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স। সরকার পরিবর্তনের পর মহারাজ পালিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির দাপট কমেনি। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্পের কাজ না করেই ১৬০০ কোটি টাকা উত্তোলনের ঘটনায় যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম এই ইউনুস ব্রাদার্স। প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতির অভিযোগে কালো তালিকাভুক্ত না হয়ে বরং গত আট মাসে বিভিন্ন দপ্তরের ২৮০টি কাজ পেয়ে গেছে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৮৩৬ কোটি টাকা। বিষয়টি ঘিরে সংশ্লিষ্ট মহলে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

একাধিক সূত্র জানায়, ইউনুস ব্রাদার্স ঠিকাদারি খাতে সাবেক আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীমের চেয়েও চতুর। জি কে শামীম দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার হলেও ইউনুস ব্রাদার্সের কর্ণধাররা রাজনৈতিক সরকারের পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সময়েও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে একের পর এক কাজ আদায় করে নিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটি নিজেরা প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে অধিকাংশ কাজ বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন জেলায় তাদের নিজস্ব ঠিকাদার প্রস্তুত থাকে, যারা নির্ধারিত অঙ্কের চুক্তিতে ইউনুস ব্রাদার্সের লাইসেন্স ব্যবহার করে দরপত্র জমা দেন। অনেকেই মনে করেন, পলাতক মহারাজকে আড়ালেই রেখে চলছে এই পুরো তদবির ও আদায়ের কাজ।

মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্সের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন গণমাধ্যমে দাবি করেন, তারা আইনের সবধরনের বিধি মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তার ভাষায়, “কাজ না করেই বিল তোলার মতো কোনো কৌশল আমাদের জানা নেই। একটি মহল আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমরা ৫০ বছরের পুরোনো কোম্পানি।” গত আট মাসে ৮৩৬ কোটি টাকার কাজ পাওয়া কি স্বাভাবিক—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটা আমাদের সক্ষমতা ও দক্ষতার প্রমাণ। আগের সরকারের আমলে অনেক নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করেই হাজার কোটি টাকার কাজ পেয়েছে।” মহারাজের সিন্ডিকেটে তাদের সম্পৃক্ততার প্রশ্ন এড়িয়ে তিনি দাবি করেন, তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই এবং তারা কাজ বিক্রি করেন না; বরং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কেউ কেউ তাদের সঙ্গে কাজ করে।

দলিলপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে ২৮০টি কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে এলজিইডির ১৭৩টি প্রকল্পে মোট দর ৬০৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর থেকে ৮১টি প্রকল্পে ৩৮ কোটি টাকা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে ১৫টি প্রকল্পে ১৭৪ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে বিএডিসির ৬টি, গণপূর্ত বিভাগের একটি, শিক্ষা প্রকৌশলের দুটি এবং খাদ্য অধিদপ্তর ও পল্লী উন্নয়ন বিভাগ থেকে একটি করে প্রকল্প।

তথ্য অনুযায়ী, ২৯ এপ্রিল একদিনেই সওজ ও পাউবো থেকে ১১টি কাজ পেয়েছে ইউনুস ব্রাদার্স, যার মধ্যে সাতটি ছিল সিরাজগঞ্জের। ৩০ এপ্রিল কিশোরগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে, ২৭ এপ্রিল পিরোজপুরে, ২৪ এপ্রিল মাদারীপুরে, ২৩ এপ্রিল বরিশাল ও জামালপুরে, ২০ এপ্রিল পিরোজপুর, দিনাজপুর, চট্টগ্রাম ও গোপালগঞ্জে একাধিক প্রকল্পে তাদের অংশগ্রহণ পাওয়া যায়। ৮ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত শুধু সওজ থেকে ইউনুস ব্রাদার্স ২৫টিরও বেশি প্রকল্পে অংশ নেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এত কম সময়ে এত বিশালসংখ্যক প্রকল্প মানসম্মতভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজ সাব-ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এর ফলে প্রকল্পের গুণগতমান বজায় থাকে না এবং দুর্নীতির দায় মূল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়। প্রকৌশলীদের ম্যানেজ করে সাব-ঠিকাদাররাই প্রকল্পের অর্থ তুলে নেয়। প্রশ্ন উঠেছে, ই-জিপি পদ্ধতির মধ্যেও কিভাবে একটি প্রতিষ্ঠান এত কাজ পাচ্ছে—এটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সম্প্রতি পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের তদন্তে উঠে আসে, এলজিইডির পিরোজপুর কার্যালয় থেকে কাজ না করেই ১৬৪৭ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এসব প্রকল্প রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল এবং চার বছরের মধ্যে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। তদন্তে প্রকাশ, সাবেক মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের ছত্রচ্ছায়ায় মহিউদ্দিন মহারাজ, তার ভাই মেরাজুল ইসলাম এবং ইউনুস ব্রাদার্স মিলে একটি শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল। শুধু পিরোজপুরেই ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইউনুস ব্রাদার্স প্রায় ৯৭ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে, যার মধ্যে কাজ না করেই তারা প্রায় ৩৮ কোটি টাকার অগ্রিম বিল তুলে নিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পিরোজপুরে প্রতিষ্ঠানটির অন্তত ৩০টি প্রকল্প এখনো ঝুলে আছে, তবে দুর্নীতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু প্রকল্পে আবার কাজ শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ মিয়া গণমাধ্যমে বলেন, ই-জিপি টেন্ডারে অনিয়মের সুযোগ নেই। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পিরোজপুরে প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়া বিল উত্তোলনের ঘটনায় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং দুদক এ বিষয়ে মামলা করেছে।

মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্সের বিরুদ্ধেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

- Advertisement -
newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *