‘জুলাই যোদ্ধাদের’ বিক্ষোভে ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া, অগ্নিসংযোগের মধ্যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর

‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরের আগে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ সঙ্গে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় পুলিশ–র‌্যাবের সংঘর্ষ, পাঁচটি গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন, আহত অন্তত ১০ পুলিশ সদস্য।

বিশেষ প্রতিনিধি :

4 Min Read
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসসহ রাজনৈতিক দলের নেতারা। ছবি - পিআইডি

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের সংঘর্ষ, ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় ‘জুলাই যোদ্ধারা’ সংসদ ভবনে প্রবেশ করে দক্ষিণ প্লাজার মঞ্চের সামনে অবস্থান নেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা অতিথিদের জন্য রাখা চেয়ারে বসে বিক্ষোভ শুরু করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বাধা উপেক্ষা করে তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আইনি সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।

আয়োজকদের অনুরোধ ও আশ্বাসেও তারা স্থান ছাড়েননি। একপর্যায়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ মঞ্চে উঠে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং দাবি পূরণের আশ্বাস দেন। আন্দোলনকারীদের চাপে সনদের অঙ্গীকারনামার পঞ্চম দফার সংশোধিত ভাষ্যও পাঠ করা হয়।

তবুও তারা মঞ্চ না ছাড়ায় সেনা, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, এপিবিএন ও ডিএমপির সোয়াত টিম মোতায়েন করা হয়। বেলা দেড়টার দিকে পুলিশ ও এপিবিএন সদস্যরা বলপ্রয়োগ করে আন্দোলনকারীদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে সরিয়ে দেন। এ সময় লাঠিচার্য ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। সংসদ প্রাঙ্গণ থেকে বের হওয়ার সময় ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ একটি অংশ গেইটের বাইরে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং পাঁচটি পুলিশ গাড়ি ভাঙচুর করে। এরপর তারা র‌্যাব ও পুলিশের দুটি অস্থায়ী কন্ট্রোলরুমে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটায়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানান, ঘটনায় অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপকমিশনার তানভীর আহমেদও রয়েছেন। তিনি বলেন, “ঘটনাস্থল থেকে দুইজনকে আটক করা হয়েছে, যাচাই-বাছাই চলছে। এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।”

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, কন্ট্রোলরুম পোড়ানোর ঘটনায় মামলা হবে কি না, তা পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সংসদ ভবনের বাইরে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। ধাওয়া খেয়ে তারা খামারবাড়ি ও আসাদগেটের দিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। পুলিশ বেলা ২টার দিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর পুরো সড়কের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং যান চলাচল বন্ধ রাখে।

বিকেল ৫টায় শুরু হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর। রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে ২৫টি দল এই সনদে সই করে।

কমিশনের সভাপতি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস স্বাক্ষর শেষে বলেন, “রাজনৈতিক দল ও ঐকমত্য কমিশন অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। এটি সারা বিশ্বের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।”

সইকারী দলগুলোর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এলডিপি, খেলাফত মজলিস, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, এবি পার্টি, নাগরিক ঐক্য, এনডিএম, গণসংহতি আন্দোলন, জেএসডি ও গণঅধিকার পরিষদসহ আরও বেশ কয়েকটি দল রয়েছে। তবে কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী), বাংলাদেশ জাসদ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সনদে সই করেনি।

- Advertisement -

সরকারের পক্ষে সনদে স্বাক্ষর করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি মুহাম্মদ ইউনূস, সহসভাপতি আলী রীয়াজ এবং কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, বিচারপতি এমদাদুল হক ও ইফতেখারুজ্জামান।

‘জুলাই যোদ্ধাদের’ বিক্ষোভ, ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া ও সহিংসতা রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনের ওপর ছায়া ফেলেছে। অনুষ্ঠান শেষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও, সনদ স্বাক্ষরের দিনে সংঘর্ষের এই ঘটনা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *