দেশের বিভিন্ন এলাকায় পোশাক, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা সামাজিক আচরণকে কেন্দ্র করে ‘নৈতিকতা রক্ষার’ দাবি তুলে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপের ঘটনা প্রায়ই সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি আরও আলোচনায় উঠে এসেছে। সাধারণভাবে এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘মরাল পুলিশিং’ বলা হয়।
সংবিধান অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, চলাফেরা ও মতপ্রকাশের অধিকার ভোগ করেন। ফলে নৈতিকতার নামে কাউকে জোরপূর্বক আটকানো, অপমান করা বা হুমকি দেওয়া সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি।
মরাল পুলিশিং কী?
‘মরাল পুলিশিং’ বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের নৈতিক মানদণ্ড অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা, বিশেষত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা ছাড়াই কাউকে বাধা দেওয়া, হেনস্তা করা বা শাস্তি দেওয়ার মতো আচরণ করা। এটি সাধারণত পোশাক, নারী-পুরুষের মেলামেশা, সাংস্কৃতিক চর্চা বা ব্যক্তিগত জীবনযাপনের ধরনকে কেন্দ্র করে ঘটে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তিগত নৈতিকতার প্রশ্নে সামাজিক মতভেদ থাকতে পারে; তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার, ব্যক্তি চিন্তা ও বিশ্বাস অন্য কারও উপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সংবিধান কী বলছে?
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী (অনুচ্ছেদ ২৭)। এছাড়া চলাফেরার স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৩৬), মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ৩৯) এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার (অনুচ্ছেদ ৩২) নিশ্চিত করা হয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্র বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আইন প্রয়োগ বা শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা নেই। ফলে ‘নৈতিকতার’ নামে কাউকে লাঞ্ছিত করা, জোরপূর্বক আটকানো বা হুমকি দেওয়া সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি।
বাস্তবতা ও বিতর্ক
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো পরিবার ও ধর্মীয় মূল্যবোধনির্ভর হওয়ায় অনেক সময় ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে সামাজিক চাপ তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক মূল্যবোধের আলোচনা থাকতে পারে, কিন্তু তা আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে গেলে রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, জনপরিসরে শালীনতা বা সামাজিক মানদণ্ডের প্রশ্ন থাকলেও তা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালত ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে সেই দায়িত্ব তুলে দিলে নৈরাজ্যের ঝুঁকি তৈরি হয়।
মরাল পুলিশিং বেআইনি, আছে জেল-জরিমানার বিধান:
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘মরাল পুলিশিং’ নামে পরিচিত এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এর মাধ্যমে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন। তাদের মতে, ব্যক্তিগত নৈতিকতার প্রশ্নে মতভেদ থাকতে পারে কিন্তু কাউকে মারধর, হুমকি, অপমান বা প্রকাশ্যে হেনস্থা করার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। এসব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এবং অন্যান্য প্রচলিত আইনের আওতায় দণ্ডনীয় অপরাধ।
কী ধরনের শাস্তি হতে পারে; কাউকে মারধর বা জখম করলে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় জেল ও জরিমানার বিধান রয়েছে। আঘাতের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তির পরিমাণ বাড়তে পারে। হেনস্থা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনে কোনো নারী বা পুরুষকে অপমান করা, শ্লীলতাহানি, ভয় দেখানো বা জোরপূর্বক বাধা দেওয়া ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এছাড়া কয়েকজন মিলে কাউকে ঘিরে ধরা প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা বা সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত করা বেআইনি সমাবেশের আওতায় পড়তে পারে, যার জন্য জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে।
এছাড়া, কারও ব্যক্তিগত মুহূর্ত বা হেনস্থার দৃশ্য ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে তা সাইবার নিরাপত্তা আইনের আওতায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে পৃথকভাবে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের ঝুঁকি থাকে।
আইনজীবীরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমন রাষ্ট্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব। সাধারণ নাগরিকের আইন প্রয়োগ বা শাস্তি দেওয়ার কোনো আইনি এখতিয়ার নেই।
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি, আইন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা এবং নাগরিকদের অধিকার বিষয়ে শিক্ষার প্রসার প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করে যে কোনো ধরনের স্বেচ্ছাচারী হস্তক্ষেপ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, ‘মরাল পুলিশিং’ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক মূল্যবোধের ভারসাম্য। সংবিধান যে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে, তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব আর সেই সীমারেখা মানাই গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম শর্ত।
