জন্মদিনে স্মরণ: উপমহাদেশের সাহিত্যে বিদ্রোহের নাম সাদত হাসান মান্টো

নিউজনেক্সট অনলাইন :

3 Min Read
সাদত হাসান মান্টো। ছবি:সংগৃহীত

উর্দু সাহিত্যের সবচেয়ে বিতর্কিত ও শক্তিমান ছোটগল্পকারদের একজন সাদত হাসান মান্টো। বাস্তবতার নির্মম রূপ, সমাজের দ্বন্দ্ব, ধর্মীয় উগ্রতা ও মানবিক সংকটকে নির্দ্বিধায় তুলে ধরার কারণে তিনি যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি বারবার হয়েছেন বিতর্কিত ও মামলা-হয়রানির শিকার। তবুও সাহিত্যে তার অবস্থান আজও অক্ষুণ্ন—বিদ্রোহ, সত্য আর নগ্ন বাস্তবতার প্রতীক হিসেবে।

১৯১২ সালের ১১ মে ভারতের পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় জন্মগ্রহণ করেন মান্টো। ব্যারিস্টার পরিবারে জন্ম হলেও শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রচলিত নিয়মের বাইরে চলা এক বোহেমিয়ান চরিত্র। পড়াশোনায় অনাগ্রহ, বইয়ের প্রতি গভীর আকর্ষণ এবং স্বাধীনচেতা স্বভাব সব মিলিয়ে তরুণ বয়সেই তিনি হয়ে ওঠেন আলাদা ধাঁচের এক মানুষ।

পরবর্তীতে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় রুশ ও ফরাসি সাহিত্য অনুবাদের মাধ্যমে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন তিনি। ভিক্টর হুগো, চেখভ, গোর্কির মতো লেখকদের অনুবাদ তাকে বিশ্বসাহিত্যের নতুন দিগন্তে নিয়ে যায়।

১৯৩০-এর দশকে তিনি বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) চলে যান এবং চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত হন। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কাজের পর ফিল্মিস্তান স্টুডিওতে চিত্রনাট্যকার হিসেবে তার পরিচিতি বাড়ে। এই সময়েই তিনি রচনা করেন অসংখ্য গল্প, যা পরবর্তীতে উর্দু সাহিত্যের ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

তার উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আতিশ পারে’, ‘ধোঁয়া’, ‘মান্টো কে আফসানে’ এবং বিতর্কিত ‘ঠাণ্ডা গোশত’, ‘খোল দো’ ও ‘সিয়াহ হাশিয়ে’। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়, যা তার লেখায় নির্মম বাস্তবতা হিসেবে প্রতিফলিত হয়।

দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানের লাহোরে চলে যান। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি মেলেনি। আর্থিক সংকট, মানসিক চাপ এবং সামাজিক চাপের মধ্যেও তিনি লিখে গেছেন দাঙ্গা, মৃত্যু ও মানবিক বিপর্যয়ের গল্প। এই সময়েই প্রকাশিত হয় ‘সিয়াহ হাশিয়ে’, যা দেশভাগ-পরবর্তী ট্র্যাজেডির শক্তিশালী দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

মান্টোর লেখার বিরুদ্ধে একাধিকবার অশ্লীলতার মামলা হয়। মোট ছয়বার আদালতে দাঁড়াতে হয় তাকে। তবুও তিনি থেমে যাননি। তার গল্পে সমাজের অন্ধকার, ভণ্ডামি ও বাস্তবতা এতটাই তীব্রভাবে উঠে এসেছে যে তা সময়ের জন্য অস্বস্তিকর হলেও ইতিহাসের জন্য অমূল্য হয়ে ওঠে।

১৯৫৫ সালের ১৮ জানুয়ারি মাত্র ৪২ বছর বয়সে লাহোরে মারা যান এই সাহিত্যিক। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন সমাজের নির্মম সত্য নিয়ে।

আজও সাহিত্যের ইতিহাসে সাদত হাসান মান্টোকে ধরা হয় এমন এক লেখক হিসেবে, যিনি সমাজকে আড়াল নয়, বরং একেবারে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলেন। তার গল্পগুলো তাই কেবল সাহিত্য নয়—একটি সময়ের দলিল, একটি সভ্যতার আয়না।

- Advertisement -
newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *