প্রতিবেশী ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো। তাদের প্রধান আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করেন, তাহলে পুরো অঞ্চল অপ্রত্যাশিত সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার মুখে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ভেঙে পড়ার খবরে সামরিক সংঘাতের শঙ্কা তীব্র আকার ধারণ করে। এর পরপরই সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের কূটনৈতিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ইরানে হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে সৌদি আরব। একই সঙ্গে কাতার ও ওমান ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে মধ্যস্থতার লক্ষ্যে।
আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের গবেষক আনা জ্যাকবস খালাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যোগাযোগের চ্যানেল হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে। তাদের কাছে স্পষ্ট ছিল না, পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে।
দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহানাদ সেলুম জানান, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত অভিপ্রায় বুঝতে পারছিল না, যা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
ইরানে সহিংসতা ও ট্রাম্পের সামরিক হুমকি
ইরানে চলমান সহিংস বিক্ষোভে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একাধিকবার সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন। ইরান সরকারের দাবি, বিক্ষোভ দমনে সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর শতাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। বিপরীতে, সরকারবিরোধীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে এক হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সহায়তা আসছে।” কী ধরনের সহায়তার কথা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট না হলেও এ বক্তব্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে তোলে।
তাদের আশঙ্কা, ইরানে সামরিক হামলা হলে তেলের বাজারে বড় ধাক্কা আসতে পারে, অঞ্চলটির ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ইরান পাল্টা হামলা চালাতে পারে। অতীতে এমন নজির রয়েছে। ২০১৯ সালে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনি হুথিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা চালায়। সাম্প্রতিক সময়েও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কাতারের আল উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা ঘটে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের কাছে এখনো ব্যালিস্টিক ও সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে। পাশাপাশি, অঞ্চলজুড়ে তাদের অনুগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও সক্রিয়।
এদিকে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে এমন সতর্কবার্তা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কসহ একাধিক দেশকে দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটি থেকে কিছু লোক সরিয়ে নেওয়া হয়।
অস্থিতিশীলতার ভয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা হঠাৎ ভেঙে পড়লে কী ধরনের শূন্যতা তৈরি হবে—তা নিয়েই মূলত উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার পর যে বিশৃঙ্খলা, গৃহযুদ্ধ ও চরমপন্থার উত্থান ঘটেছিল, তার পুনরাবৃত্তি কেউ চায় না।
খালাফের মতে, অনেক দেশ ইরানের নেতৃত্ব দুর্বল দেখতে চাইতে পারে, তবে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়লে যে অনিশ্চয়তা ও চরমপন্থা জন্ম নেবে, সেটিই তাদের সবচেয়ে বড় ভয়।
কাতার, কুয়েত ও ওমান ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে সহাবস্থানের পথ বেছে নিয়েছে। কাতার ও ইরান বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র যৌথভাবে ব্যবহার করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ফলে ইরানে অস্থিরতা দেখা দিলে এসব দেশের অর্থনীতিও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক বাস্তববাদী পর্যায়ে এসেছে। সৌদি আরব আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কারণ অর্থনীতির বৈচিত্র্য ও পর্যটন খাতের উন্নয়নে স্থিতিশীল পরিবেশ তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সৌদি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আদেল আল-জুবেইর বলেন, সৌদি আরব শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষেই অবস্থান করছে। তবে কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরানে ধীরে ও নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন এলে রিয়াদ তা মেনে নিতে পারে। কিন্তু আকস্মিক শাসন পতন পুরো অঞ্চলকে আগুনে ঠেলে দেবে এমন আশঙ্কাই এখন সবার মুখে মুখে।
এক কথায়, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরান ইস্যুতে ভারসাম্য রক্ষা করতে চায় সংঘাত নয়, বরং কূটনীতি ও স্থিতিশীলতার পথেই হাঁটতে আগ্রহী তারা।
