পদত্যাগের পালে লেগেছে হাওয়া

বিশেষ প্রতিনিধি :

বিশেষ প্রতিনিধি :

5 Min Read
ফটো ক্লোলাজ, গ্রাফিক্স ছবি।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, দুর্নীতি দমন সংস্থা ও উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে একের পর এক পদত্যাগ ও অপসারণের ঘটনা ঘটছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে শুরু করে বীমা খাত, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবখানেই শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনের এই ধারায় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের আভাস দেখছেন বিশ্লেষকরা।

স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানো ও চুক্তি বাতিল—দুই প্রক্রিয়াতেই বদলে যাচ্ছে নেতৃত্বের চিত্র, যা দেশের নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী গত সোমবার (২ মার্চ) আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ব্যক্তিগত কারণ উল্লেখ করে দায়িত্ব ছেড়েছেন তিনি। সাবেক অর্থসচিব ও কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল মুসলিম চৌধুরীকে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট তিন বছরের জন্য এ পদে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

একই দিন সাধারণ বীমা করপোরেশন-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারীও পদত্যাগপত্র জমা দেন। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি দায়িত্ব ছাড়েন বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিন বছরের জন্য তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এর আগে তিনি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর চেয়ারম্যান ছিলেন এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সেখান থেকেও সরে দাঁড়ান।

আইডিআরএ-তেও এসেছে পরিবর্তন। সংস্থাটির চেয়ারম্যান এম আসলাম আলমও সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে এক সভায় পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান আসলাম আলম। অতীতে তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এবং পরে পিএটিসির রেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

দুর্নীতি দমন ব্যবস্থায়ও বড় রদবদল হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে দায়িত্ব ছাড়েন তদন্ত কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও অনুসন্ধান কমিশনার হাফিজ আহসান ফরিদ। তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে কার্যালয় ত্যাগ করেন। আব্দুল মোমেন বলেন, নির্বাচিত সরকার চাইলে নিজেদের ভাবনায় কমিশন পুনর্গঠন করতে পারে, এই উপলব্ধি থেকেই তারা সরে দাঁড়িয়েছেন।

উচ্চশিক্ষা অঙ্গনেও পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক ৫ দিনের মাথায় (২২ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তিনি ডেপুটেশন থেকে অব্যাহতি নিয়ে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে মূল পদে ফিরে যেতে চান। দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করবেন। ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট তিনি উপাচার্যের দায়িত্ব পান।

সোমবার (২ মার্চ) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের পদত্যাগপত্র সরকার গ্রহণ করেছে এবং প্রোভিসি ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

তবে পদত্যাগের সুযোগ পাননি সদ্য সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। ২৫ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ আবরাউল হাছান মজুমদার স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে ড. আহসান এইচ মনসুরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে সরকার। নিজেদের বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের দবিতে আন্দোলন করে আসা বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের কাছে বেশ চাপের মুখেই ছিলেন আহসান এইচ মনসুর।

- Advertisement -

প্রজ্ঞাপন জারির খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যালয় ত্যাগ করেন ড. মনসুর। পদত্যাগ করেছেন কি না এ প্রশ্নে তিনি সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করিনি, তবে খবরে শুনেছি।’ এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সেদিন সকালে তিনি স্বাভাবিক নিয়মে কার্যালয়ে আসেন এবং নিয়মিত কাজ শুরু করেন। তবে অপসারণের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। পরে তিনি সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক না করেই তাৎক্ষণিকভাবে অফিস ত্যাগ করেন।

তার পরপরই গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে জোর করে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বের করে দেন বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের আন্দোলনরত সদ্যরা। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকে এক ধরনের চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

- Advertisement -

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ৯ আগস্ট পদত্যাগ করেন। এরপর ১৩ আগস্ট সরকার অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই এসব পদত্যাগ ঘটছে। কেউ কেউ এটিকে স্বাভাবিক রূপান্তর বললেও, একযোগে এত শীর্ষ পদে পরিবর্তন প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিগত ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছে। সামনে নতুন নিয়োগের মাধ্যমে কোন পথে এগোয় প্রশাসনিক কাঠামো সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *