হামের থাবায় সংকটে শিশুস্বাস্থ্য

খায়রুল আলম :

3 Min Read
ছবি - সংগৃহীত।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের উদ্বেগজনক বিস্তারকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কেবল একটি স্বাভাবিক প্রাদুর্ভাব হিসেবে দেখছেন না; বরং এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল বলে মনে করা হচ্ছে।

একসময় যেখানে দেশটি টিকাদান কর্মসূচিতে বৈশ্বিক সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে ২০২৫ সালে টিকাদানের কাভারেজে নজিরবিহীন পতন পরিস্থিতিকে নতুন করে সংকটময় করে তুলেছে।

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের কাভারেজ ছিল ৮৬ থেকে ১০০ শতাংশের মধ্যে। কিন্তু ২০২৫ সালে তা হঠাৎ করেই নেমে আসে প্রায় ৫৬ থেকে ৬০ শতাংশে।

এই বড় ধরনের পতনকে বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভাঙনের একটি স্পষ্ট সংকেত হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৮ থেকে বেড়ে ৬৭৬-এ পৌঁছানো পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ সময়ে অন্তত ৩৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও জনস্বাস্থ্য উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, টিকাদান কর্মসূচির এই দুর্বলতার পেছনে ২০২৪-২৫ সালের অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত পরিবর্তন বড় ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিল করে ‘আমব্রেলা অ্যাপ্রোচ’ চালুর সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্য খাতে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। এর ফলে বাজেট ছাড়, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়, যা সরাসরি জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এছাড়া টিকা সরবরাহ ব্যবস্থায়ও গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে দেশে টিকা পৌঁছালেও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রশাসনিক অনুমোদনের জটিলতায় সেগুলোর একটি অংশ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পড়ে থাকে এবং সময়মতো মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। একই সময়ে নির্ধারিত ‘ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন’ বাস্তবায়িত না হওয়ায় অনেক শিশু নিয়মিত টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়, ফলে জনসংখ্যার মধ্যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়।

মাঠপর্যায়ের মানবসম্পদের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ইপিআই কর্মসূচিতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় গ্রাম ও উপশহর পর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশুদের ওপর, বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যারা সাধারণত ‘হার্ড ইমিউনিটি’র ওপর নির্ভরশীল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগ সাধারণত তখনই ফিরে আসে, যখন টিকাদান ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমান পরিস্থিতিকে তারা একটি “সিস্টেমিক ফেইলিউর” হিসেবে উল্লেখ করছেন, যেখানে নীতি, ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের ঘাটতি মিলেই এই সংকট সৃষ্টি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন। তারা বলছেন, অবিলম্বে একটি জাতীয় ‘ক্যাচ-আপ ইমিউনাইজেশন ক্যাম্পেইন’ চালু করে টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি টিকা সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন, কোল্ডচেইন ব্যবস্থার উন্নয়ন, জরুরি বাজেট বরাদ্দ এবং মাঠপর্যায়ের জনবল সংকট দূর করা জরুরি।

- Advertisement -

এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে নীতি-স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব শুধু একটি রোগের বিস্তার নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকারিতা ও নীতিনির্ধারণের সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষাও বটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই সংকট আরও গভীর আকার ধারণ করতে পারে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *