ঢাকায় পেট্রল পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো, সরকারি কর্মকর্তাদের দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ এমন দৃশ্য এখন রাজধানীর দৈনন্দিন জীবন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণপরিবহন কমে গেছে, ডেলিভারি কর্মীরা বসে আছেন, এবং শহরের স্বাভাবিক চলাচল প্রায় থমকে গেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে চলমান সংঘাত এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের প্রভাবে বাংলাদেশ শীঘ্রই তেল ও গ্যাসের মারাত্মক ঘাটতির মুখোমুখি হতে পারে। সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এ দেশটি বিশ্বের প্রথম বড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং এলএনজির প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ার দেশগুলোতে যায়। বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশের তেল ও গ্যাসের প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করা হয়, যার দুই-তৃতীয়াংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকসহ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে।
মার্চের শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি ইস্টার্ন রিফাইনারিতে মাত্র ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুদ ছিল, যা মাত্র ১৭ দিনের ব্যবহার চালাতে পারবে। এ ছাড়াও ডিজেল ও পেট্রলের মজুদ সীমিত। ফলে সরকার নতুন জ্বালানি সংগ্রহে বিশ্বব্যাপী তৎপর। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৬ লাখ টন রাশিয়ান ফুয়েল অয়েল আমদানি করার অনুমতি চাওয়া হয়েছে এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে ৬০ হাজার টন সরবরাহ এসেছে। তবে ভারতের কাছ থেকে ৬০ হাজার টন ডিজেল পাওয়ার চুক্তি থাকলেও দেশটির নিজস্ব সংকটের কারণে সরবরাহ স্থবির।
সংকট কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারত, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া ও জ্বালানি সংকটের সঙ্গে মোকাবিলা করছে। ভারতের শিল্প উৎপাদন গ্যাস সংকটের কারণে কমে গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। ফিলিপাইন জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে, ভিয়েতনামের কৌশলগত মজুদ তিন সপ্তাহ চলার মতো, আর জাপান ৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল মুক্ত করেছে যা প্রায় ৪৫ দিন চলবে। মিয়ানমারে সেনাবাহিনী রেশনিং চালু করেছে, এবং কম্বোডিয়ায় এক-তৃতীয়াংশ পেট্রল পাম্প বন্ধ হয়েছে।
ঢাকায় ইতিমধ্যেই পরিস্থিতির প্রভাব স্পষ্ট। পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, সরকারি অফিসে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আর গণপরিবহন কমে যাওয়ায় শহরের দৈনন্দিন জীবন প্রভাবিত হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির মজুদ মাত্র ১০ থেকে ২১ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে পারে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি অস্বীকার করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সংসদে বলেছেন, দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই, বরং গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বেড়েছে। তার মতে, অতিরিক্ত চাহিদাই সমস্যার মূল কারণ, মোটরসাইকেল চালকরা আগের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি জ্বালানি কিনছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের দ্রুত, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
