বাংলা বছরের অন্তিম প্রান্তে এসে বিদায় নিচ্ছে ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। চৈত্র মাসের শেষ দিন, অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে বিদায় ও নতুনকে বরণের আবহ। আজ ৩০ চৈত্র, পুরোনো বছরের গ্লানি ঝেড়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতিতে মুখর হয়ে উঠেছে জনজীবন।
চৈত্র সংক্রান্তি শুধু একটি পঞ্জিকার শেষ দিন নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি দিন। বছরের শেষ প্রান্তে এসে পুরোনো দুঃখ-কষ্ট ভুলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করার এক প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয় এ দিনটিকে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন আয়োজনে পালিত হলেও চৈত্র সংক্রান্তির মূল ভাবনা একই, পুরোনোকে বিদায় এবং নতুনের আহ্বান। একসময় এটি নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তিনদিনব্যাপী উৎসবের মাধ্যমে এ দিনটি উদযাপন করে, যা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গ্রামবাংলায় চৈত্র সংক্রান্তির আমেজ সবচেয়ে বেশি প্রাণবন্ত। পুরোনো বছরের হিসাব-নিকাশ শেষ করে নতুন বছরের সূচনায় ‘হালখাতা’ খোলার প্রস্তুতি নেয় ব্যবসায়ীরা। খাদ্যাভ্যাসেও রয়েছে ঐতিহ্য অনেকে আমিষ পরিহার করে নিরামিষ খাবার গ্রহণ করেন, কোথাও ১৪ ধরনের শাক রান্নার প্রথাও দেখা যায়। স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় তেতো ও শাকসবজি খাওয়ার এই রীতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শিবপূজা, ব্রতপালনসহ নানা ধর্মীয় আচার পালনের মধ্য দিয়ে তারা দিনটি উদযাপন করেন। সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে ভবিষ্যতের মঙ্গল কামনার প্রার্থনাও করা হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহুরে জীবনে এ উৎসবের ধরন বদলালেও মেলা, লোকসংগীত, যাত্রাপালা, পুতুলনাচ ও পটচিত্রের মতো গ্রামীণ সংস্কৃতির উপাদান এখনো এ দিনকে প্রাণবন্ত করে তোলে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে।
এ বছরও চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। রাজধানীতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে লোকশিল্প প্রদর্শনী, সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা, যাত্রাপালাসহ নানা আয়োজন থাকবে। এতে লোকসংগীত, জারিগান, পুঁথিপাঠ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবেশনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চারুকলার শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে আল্পনা অঙ্কনসহ নানা প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাদের মতে, চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষের এই সন্ধিক্ষণ নতুন সৃষ্টির এক অনন্য সময়।
সব মিলিয়ে চৈত্র সংক্রান্তি বাঙালির জীবনে এক অনন্য তাৎপর্যময় দিন যেখানে বিদায়ের বেদনার সঙ্গে মিশে থাকে নতুন বছরের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের পথে এগিয়ে যাওয়ার এই চিরন্তন বার্তাই প্রতি বছর নতুন করে মনে করিয়ে দেয় সময়ের অবিরাম প্রবাহকে।
