বিনিয়োগের বড় প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়নেই নির্ভর করবে নতুন অর্থবছরের সাফল্য

বিশেষ প্রতিনিধি :

বিশেষ প্রতিনিধি :

4 Min Read

নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট, নতুন মুদ্রানীতি এবং একাধিক বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছর। সরকারের লক্ষ্য অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানে বড় ধরনের গতি আনা।

তবে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ঘোষিত এসব লক্ষ্য বাস্তবে কতটা অর্জন সম্ভব তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা।

বিনিয়োগে জোর, সংস্কারের বড় ঘোষণা

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সরকার বেসরকারি বিনিয়োগকে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থমন্ত্রীর ঘোষিত ‘থ্রি আর’ রিকভারি, রিস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন—কৌশলের কেন্দ্রেও রয়েছে বেসরকারি খাতের পুনরুজ্জীবন।

বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসা সহজীকরণে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাত দিনের মধ্যে লাইসেন্স প্রদান, ৪৮ ঘণ্টায় কোম্পানি নিবন্ধন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দ্রুত ভিসা, প্লাগ অ্যান্ড প্লে শিল্প সুবিধা, গ্রিন চ্যানেলে আমদানি ছাড় এবং কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন।

সরকার আশা করছে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যবসার সময় ও ব্যয় কমবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।

কর্মসংস্থানে বড় লক্ষ্য

নতুন বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে প্রযুক্তি খাতে বছরে ২ লাখ কর্মসংস্থান, ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে ৫ লাখ, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ৫ লাখ ৫০ হাজার এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে কয়েক লাখ মানুষের কাজের সুযোগ।

এ ছাড়া হাইটেক পার্ক, এসএমই খাত, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং ও প্রবাসী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে আইসিটি খাতের অবদান জিডিপির ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়েছে।

- Advertisement -

বন্ধ শিল্প চালুর উদ্যোগে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল

অর্থনৈতিক সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই উদ্যোগ সফল হলে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

তবে ব্যবসায়ী মহল সতর্ক করে বলছে, এই তহবিল যেন অতীতের মতো অকার্যকর না হয় এবং প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হাতেই অর্থ পৌঁছায়।

- Advertisement -

উচ্চ সুদহার ও জ্বালানি সংকট বড় চ্যালেঞ্জ

বিনিয়োগবান্ধব ঘোষণার মধ্যেও বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখায় ঋণের ব্যয় বেশি থাকছে। ফলে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

এ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চয়তা, ডলারের ওপর চাপ, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) বলছে, রাজস্বনীতি বিনিয়োগবান্ধব হলেও মুদ্রানীতির সঙ্গে সমন্বয় নেই। উচ্চ সুদের হার বেসরকারি খাতকে আরও চাপের মুখে ফেলছে।

আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, শুধু কর ছাড় দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়; প্রয়োজন জ্বালানি নিরাপত্তা, নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং প্রশাসনিক দক্ষতা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২–২৩ শতাংশে স্থবির রয়েছে। এই অবস্থা থেকে বের হতে হলে আস্থা পুনরুদ্ধারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

রাজস্ব আদায়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য

নতুন বাজেটে এনবিআরের জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদরা এটিকে উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছেন।

তাদের মতে, রাজস্ব আদায় ব্যর্থ হলে সরকারকে ব্যাংকঋণের ওপর আরও নির্ভর করতে হবে, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে।

বাস্তবায়নই হবে মূল পরীক্ষা

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন অর্থবছরের বাজেট ও মুদ্রানীতিতে ঘোষিত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান অর্জন কঠিন হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগামী দিনের প্রশ্ন একটাই—ঘোষিত সংস্কার ও নীতিগুলো কি বাস্তবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে রূপ নিতে পারবে, নাকি প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *