পাসপোর্ট কর্মকর্তা মাকসুদুর রহমান ও স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পদের তথ্য, তদন্তের দাবি

বিশেষ প্রতিনিধি :

বিশেষ প্রতিনিধি :

6 Min Read
মো. মাকসুদুর রহমান।

কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মো. মাকসুদুর রহমানের সম্পদ অর্জন ও দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মাসিক বেতন-ভাতার তুলনায় তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদ থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ঢাকার মোহাম্মদপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দায়িত্ব পালনকালে একটি দালালচক্রের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগও উঠেছে। নিউজনেক্সটের অনুসন্ধান চলাকালীন সময়ে সাম্প্রতিক তাঁকে কক্সবাজারে বদলি করা হয়।

অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন নথি ও ভূমি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, মাকসুদুর রহমান এবং তাঁর স্ত্রী নাসরিন আক্তারের নামে রাজধানীর গুলশান, লালবাগ, জোয়ার সাহারা, মানিকদীসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা হতে পারে। তবে সম্পদের এই মূল্যায়ন স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তার বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ভাষানচরে। স্ত্রী নাসরিন আক্তারের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায়। বর্তমানে তারা থাকেন রাজধানীর মানিকদী এলাকায়। মো. মাকসুদুরের পিতা মো. সিদ্দিকুর রহমান মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সেই সূত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় একই পরিবারের ৯ সদস্য সরকারি চাকরি করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মো. মাকসুদুর রহমানের এই বিশাল সম্পদের বড় অংশই অর্জিত হয়েছে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কর্মরত থাকাবস্থায়। অবৈধভাবে আয় করা এসব অর্থের লেনদেন হয়েছে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জমি ও অন্যান্য সম্পত্তি :

সরেজমিনে ঘুরে ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক মাকসুদুরের নিজের নামে এবং স্ত্রীর নামে ঢাকার পাঁচটি এলাকায় জমি রয়েছে। যার পরিমাণ প্রায় ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ। এর মাঝে বেশির ভাগ সম্পদ ক্রয় করেছেন স্ত্রীর নামে। নিজের নামে লালবাগে এবং মানিকদিতে জমির শেয়ারসহ ফ্ল্যাট রয়েছে। লালবাগে বোন রেহেনা এবং শ্যালিকা সোনিয়ার আক্তারের সাথেও যৌথভাবে জমির শেয়ার রয়েছে মাকসুদুর রহমানের। রাজধানীর লালবাগ এলাকায় দাগ নং-৭০১, হোল্ডি নং-৩৩/১০, খতিয়ান নং-২৫০২ মৌজা দক্ষিণ সোনা টেংগর, শিবপুর ভূমি অফিসের আওতায় ০ দশমিক ৭৩৮ শতাংশ (আবাসিক) জমিসহ ফ্ল্যাটের শেয়ার, যার বর্তমান বাজার মূল্য সাড়ে ৩ কোটি টাকা প্রায়। একই এলাকায় মৌজা দক্ষিণ সোনা টেংগর- ৫, দাগ নং ৭০১, খতিয়ান নং- ২০২৫/১০০১০৭, হোল্ডিং নং- ২০২৫ / ১০০১০৭, শিবপুর ভূমি অফিসের আওতায় ০ দশমিক ৩৩৩৩ শতাংশ জমি রয়েছে, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় পৌণে ২ কোটি টাকা।

স্ত্রীর নাসরিন আক্তারের নামে গুলশানের ডুমনি-৬ মৌজায় হোল্ডিং নং: ৩৩/৪৭, খতিয়ান নং : ১১৬৭৮, দাগ নং: ১০৮০৩, ১০৮০৭, ১০৮০৮, তিন দাগে ডুমনী ভূমি অফিসের আন্ডারে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ (আবাসিক) যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ২১ কোটি টাকা। গুলশানের ডুমনি-৬ মৌজায়, হাল্ডিং নং : ৯১/৩৩, খতিয়ান নং: ৯০২৯, দাগ নং: ১০৮০৩, ডুমনী ভূমি অফিসে ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ জমি যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা প্রায় । গুলশানের ডুমনি-৬ মৌজায়, হাল্ডিং নং: ৮৮/৩৩, খতিয়ান নং: ৯০২৬, দাগ নং: ১০৮০৩, ১০৮০৮ ডুমনী ভূমি অফিসে ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ জমি যার বাজার মূল্য ৯ কোটি টাকা প্রায়।

ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকা নাসরিন আক্তার এর নামে ০ দশমিক ৬৯৯ শতাংশ জমি, যার দাগ নং: 34427,34327 ও 34324 খতিয়ান নং : ৬১৫১৪, হোল্ডিং নং: ১৭৯/৩১৫, মৌজা জোয়ার সাহারা-৩, ক্যান্টনমেন্ট ভূমি অফিস। বর্তমান বাজার মূল্য ৩ কোটি টাকা প্রায়। ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় নাসরিন আক্তারের নামে ০ দশমিক ০৯৭৬ শতাংশ জমির উপরে ফ্লাট যার দাগ নং: ৩৪৩২৪, ৩৪৩২৮, খতিয়ান নং : ৬১৭২৮, হোল্ডিং নং : ১/৩১৭, মৌজা জোয়ার সাহারা- ৩. ক্যান্টনমেন্ট ভূমি অফিস। যার বর্তমান বাজার মূল্য- ৪ কোটি টাকা প্রায়। এছাড়াও তার নামে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় ০ দশমিক ৩৯৬৭ শতাংশ জমি উপরে ফ্লাট যার দাগ নং: ২০৭৫, খতিয়ান নং : ( ১০৬৪) ২০২৫/১০০১০১, হোল্ডিং নং: ২০২৫/১০০১০১, মৌজা লালাসরাই-৭, দলিল নং: ৫৯৪৫, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস পল্লবী, রেজিস্ট্রেশনের তারিখ: ১৭/০৯/২০১৭ ক্যান্টনমেন্ট ভূমি অফিস। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা।

এছাড়া মাকসুদুর রহমান তার বোন রেহেনা রশিদ ও শ্যালিকা সোনিয়া আক্তারের নামে একই দাগে জমি ক্রয় করেছেন। এছাড়াও তার নামে রাজধানীর পূর্ব মানিকদী, ক্যান্টনমেন্ট, ঠিকানা ৫৭২/জি একটি ফ্লাট রয়েছে। নিজ নামে ঢাকা মেট্রো রেজিস্ট্রেশন নম্বর: চ-২০-৬২৩২ একটি গাড়িও রয়েছে।

সাত ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট মাকসুদুর রহমানের নামে সোনালি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও এনআরবি ব্যাংকে একাউন্ট রয়েছে। স্ত্রী নাসরিন আক্তারের নামে ব্র্যাক ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। এসব হিসাবে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য অনেক গড়মিল পাওয়া যায়। তাদের আয়কর নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায় সম্পদের সাথে আয়কর নথির কোন মিল নেই।

- Advertisement -

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোহাম্মদপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, মো. মাকসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় একাধিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে তাঁর প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাননি।

তিনি দাবি করেন, ওই সময়ে অফিসে তাঁর প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য, ফলে অভ্যন্তরীণভাবে অভিযোগ থাকলেও তা প্রকাশ্যে আসেনি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দায়িত্ব পালনকালে তাঁর আচরণ ও কার্যক্রম ঘিরে সহকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের চাপ ও উদ্বেগের পরিবেশ ছিল।

আরেকটি মন্তব্যে ওই কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের অভিযোগ ওঠা কর্মকর্তাদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে অবৈধ সম্পদের উৎস ও অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা যায় এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।

- Advertisement -

অভিযোগের বিষয়ে ফোন করে ও ফোনে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *