রঙ, রেখা ও সৃজনের এক উজ্জ্বল নাম মুস্তাফা মনোয়ার

চিত্রশিল্পী, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, শিল্পশিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক—প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর সৃষ্টিকর্ম, শিল্পচিন্তা এবং নতুন প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্থায়ীভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। যিনি রঙ, পুতুল আর স্বপ্ন দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন প্রজন্মের শৈশব।

মনিরুল ইসলাম :

মনিরুল ইসলাম :

3 Min Read

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির আকাশে আরেকটি নক্ষত্রের পতন হলো। একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য চিত্রশিল্পী, পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ, শিল্পশিক্ষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। কয়েক সপ্তাহ ধরে নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যু শুধু একজন শিল্পীর বিদায় নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি এবং শিশুদের সৃজনশীল জগতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি। তিনি এমন এক শিল্পী, যিনি ক্যানভাসের গণ্ডি পেরিয়ে শিল্পকে পৌঁছে দিয়েছিলেন শিশুদের হাতে, মানুষের ঘরে এবং গণমাধ্যমের পর্দায়।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে তিনি চারুকলায় শিক্ষা সম্পন্ন করেন। দেশে ফিরে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও খুব দ্রুতই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বহুমাত্রিক শিল্পস্রষ্টা হিসেবে।

বাংলাদেশের পাপেটশিল্পের ইতিহাসে তাঁর নাম উচ্চারণ করা হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতের শরণার্থী শিবিরে শিশুদের মানসিক শক্তি জোগাতে তিনি পুতুলনাটক পরিবেশন করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে তাঁর সেই উদ্যোগ ছিল এক অনন্য মানবিক শিল্পচর্চা। পরবর্তীকালে বাংলাদেশে পাপেটশিল্পকে জনপ্রিয় করে তুলতে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রণী। অনেকেই তাঁকে ভালোবেসে ডাকতেন ‘বাংলাদেশের পাপেট ম্যান’।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসেও মুস্তাফা মনোয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য নাম। শিশুদের জন্য নির্মিত অনুষ্ঠান, পুতুলনাটক এবং সৃজনশীল উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি কয়েকটি প্রজন্মের শৈশবকে রঙিন করে তুলেছিলেন। শিল্পকে তিনি বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষা, মানবিকতা ও কল্পনাশক্তি বিকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখতেন।

চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর কাজেও ছিল স্বতন্ত্র ভাষা। দেশীয় ঐতিহ্য, প্রকৃতি, লোকজ সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনসংগ্রাম তাঁর ছবিতে নানা মাত্রায় উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন দক্ষ শিল্পসংগঠক ও প্রশাসক। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য শিল্পী, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীর প্রেরণার উৎস ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। শিল্পচর্চাকে তিনি কখনো কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং নতুন প্রজন্মের সৃজনশীল বিকাশকে জীবনের অন্যতম দায়িত্ব বলে মনে করতেন।

দেশের শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। পরে সুলতান স্বর্ণপদকসহ দেশ-বিদেশের আরও অনেক সম্মাননা অর্জন করেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন একজন নির্মাতা, যিনি মানুষের ভেতরে শিল্পবোধ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন।

মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিল্পী, লেখক ও গুণগ্রাহীরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন।

- Advertisement -

একজন শিল্পী যখন চলে যান, তাঁর ক্যানভাস হয়তো থেমে যায়; কিন্তু তাঁর রঙ থেমে থাকে না। মুস্তাফা মনোয়ারের তুলির আঁচড়, পুতুলের প্রাণ, শিশুদের মুখে ছড়িয়ে দেওয়া হাসি আর শিল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আজীবন সাধনা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে আলো ছড়াবে। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর দর্শন এবং তাঁর শিল্পচেতনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথচলায় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *