শেয়ারবাজারে অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগে নুসরাত নাহার নামে এক নারীর বিরুদ্ধে প্রায় ৩০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টদের দাবি, নিয়ম বহির্ভূত পদ্ধতিতে বিও হিসাব ব্যবহার করে এই অর্থ শেয়ারবাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
শেয়ারবাজারে লেনদেনের জন্য গ্রাহকের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে যুক্ত বিও হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ২০২০ সালের বিধিমালা অনুযায়ী, বিও হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন অবশ্যই গ্রাহকের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে করতে হয়। তবে এই ঘটনায় সেই বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে অবস্থিত এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট নামের একটি ব্রোকারেজ হাউসে নুসরাত নাহার মাত্র ৫০০ টাকা দিয়ে একটি বিও হিসাব খোলেন। ওই হিসাবে সরাসরি কোনো অর্থ জমা না থাকলেও পরবর্তীতে লুবরেফ বাংলাদেশ লিমিটেডের ৮৮ লাখ ইউনিট শেয়ার জমা হয়, যা কোম্পানির মোট শেয়ারের প্রায় ৬ শতাংশ। ফেস ভ্যালু অনুযায়ী এসব শেয়ারের মূল্য ছিল প্রায় ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
তদন্তে উঠে এসেছে, এসব শেয়ার প্রি-আইপিও বা অন্য কোনো বৈধ প্রক্রিয়ায় কেনা হলেও তার বিপরীতে অর্থ পরিশোধের সুনির্দিষ্ট ব্যাংকিং ডকুমেন্ট পাওয়া যায়নি। নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি হিসেবে বিদেশ থেকে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ আনার প্রমাণও পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
এছাড়া রাজধানীর বাংলামটরে অবস্থিত বিএলআই ক্যাপিটাল লিমিটেডের নামে সাউথইস্ট ব্যাংকে পরিচালিত একটি করপোরেট হিসাব ব্যবহার করে নুসরাত নাহারের নামে প্রায় ১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকার শেয়ার কেনা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় নুসরাতের নিজের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব না থাকলেও পে-অর্ডারের মাধ্যমে এই লেনদেন সম্পন্ন করা হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শেয়ার বিক্রির পর প্রাপ্ত অর্থের বড় অংশ কোনো ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে জমা না হয়ে নগদ বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে। নুসরাতের নামে থাকা বিও হিসাব থেকে মো. আব্দুল খালেক নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে নগদ উত্তোলনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। অথচ বিধি অনুযায়ী বিও হিসাব থেকে নগদ উত্তোলনের সুযোগ নেই।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বিএলআই ক্যাপিটাল ও বিএলআই লিজিং নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ঋণ ব্যবহার করে নুসরাত নাহারের নামে শেয়ার কেনা দেখানো হয়েছে এবং পরবর্তীতে সেই অর্থ পাচার করা হয়েছে। রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নুসরাতের নামে পরিচালিত বিও হিসাব থেকে উত্তোলিত প্রায় ৩০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা কোনো বৈধ ব্যাংক হিসাবে জমা হয়নি।
এ ঘটনায় ব্রোকারেজ হাউসের অডিট ও তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কয়েক বছর ধরে এসব অনিয়ম চললেও তা শনাক্ত না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ বিষয়ে নুসরাত নাহার বর্তমানে দেশে না থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। তার বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী বৈধ উৎস ছাড়া বিপুল অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর ও ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে অর্থ পাচার গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিষয়টি তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।
