গ্রিনল্যান্ড কেন ট্রাম্পের কৌশলগত লক্ষ্য: বরফের নিচে ভূরাজনীতির যুদ্ধ

সালমিন রহমান :

6 Min Read

ডোলাল্ড ট্রাম্প  যখন প্রথমবার গ্রিনল্যান্ড “কিনে নেওয়ার” আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, তখন অনেকেই বিষয়টিকে কৌতুক বা ব্যক্তিগত খামখেয়াল বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, ততই পরিষ্কার হয়েছে গ্রিনল্যান্ড কেবল বরফে ঢাকা একটি দূরবর্তী দ্বীপ নয়; এটি আজকের বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত কেন্দ্র। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা টানানোর প্রতীকী বক্তব্য ও “দখল” করার ইঙ্গিত বিষয়টিকে নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো ট্রাম্প আসলে কেন গ্রিনল্যান্ড চান? এর পেছনে কী রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব আছে? আর গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ কার সঙ্গে থাকা উচিত?

কেন গ্রিনল্যান্ড এত গুরুত্বপূর্ণ?

গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপ, যার প্রায় পুরোটাই বরফে ঢাকা। কিন্তু এই বরফের নিচে লুকিয়ে আছে বিরল খনিজ, বিরল পৃথিবীর উপাদান (rare earths), ইউরেনিয়াম, লিথিয়াম, এমনকি সম্ভাব্য তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডার। আধুনিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সেমিকন্ডাক্টর ও সামরিক সরঞ্জামের জন্য এই খনিজগুলো অপরিহার্য। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপ সবাই ভবিষ্যতের কাঁচামালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রিনল্যান্ডের দিকে তাকিয়ে আছে।

এর চেয়েও বড় কারণ হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত যেখান থেকে রাশিয়ার সামরিক তৎপরতা, চীনের আর্কটিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ইউরোপ-আমেরিকার সমুদ্রপথ নজরদারি করা তুলনামূলক সহজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে (থুলে এয়ার বেস)। অর্থাৎ বাস্তবে গ্রিনল্যান্ড ইতোমধ্যেই আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার ভেতরে আছে।

ট্রাম্প কেন গ্রিনল্যান্ড পেতে চান?

ট্রাম্পের আগ্রহের পেছনে তিনটি প্রধান স্তম্ভ কাজ করছে।

প্রথমত, জাতীয় নিরাপত্তা। ট্রাম্প বারবার বলেছেন, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব বাড়ছে, আর গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি “নিরাপত্তা বাফার জোন” হতে পারে। তার দৃষ্টিতে, গ্রিনল্যান্ডের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ মানে উত্তর গোলার্ধে সামরিক ও কৌশলগত আধিপত্য আরও শক্তিশালী করা।

দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতের সম্পদ রাজনীতি। আজ হয়তো গ্রিনল্যান্ডে খনিজ উত্তোলন ব্যয়বহুল, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলছে, প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে, খরচ কমছে। ফলে আগামী কয়েক দশকে গ্রিনল্যান্ড বৈশ্বিক কাঁচামাল সরবরাহের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হতে পারে। ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” দর্শনের সঙ্গে এটি পুরোপুরি মানানসই ভবিষ্যতের সম্পদ আগে থেকেই নিজেদের দখলে নেওয়া।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ইমেজ ও শক্তির প্রতীক। ট্রাম্প বরাবরই নিজেকে একজন “ডিলমেকার” হিসেবে তুলে ধরেন। তার দৃষ্টিতে, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ মানে ইতিহাসে নাম লেখানো একটি বিশাল ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করা। এটি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

- Advertisement -

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা

ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বলেছেন, “গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।” গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় সরকার ও জনগণও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে চায়, কোনো শক্তির দখলে যেতে চায় না। সাম্প্রতিক সময়ে হাজার হাজার গ্রিনল্যান্ডবাসী রাস্তায় নেমে “Greenland is not for sale” স্লোগান দিয়েছে, যা বিষয়টিকে কেবল কূটনৈতিক নয়, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে রূপ দিয়েছে।

মজার বিষয় হলো, ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেও এই ধারণাকে “অবাস্তব ও ক্ষতিকর” বলা হয়েছে। অনেক মার্কিন বিশ্লেষকের মতে, এই ধরনের হুমকিমূলক ভাষা ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দুর্বল করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ওপর আঘাত হানতে পারে।

- Advertisement -

এটা কি বাস্তবে সম্ভব?

বাস্তবতা হলো গ্রিনল্যান্ড দখল করা প্রায় অসম্ভব।

প্রথমত, আন্তর্জাতিক আইন। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী কোনো স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ডকে জোর করে দখল করা বৈধ নয়। ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। একতরফা দখল মানে ন্যাটোর ভেতরই গুরুতর সংঘাত সৃষ্টি করা।

দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক নীতি। গ্রিনল্যান্ডের জনগণের ইচ্ছা ছাড়া কোনো অধিগ্রহণ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। আর এখন পর্যন্ত তাদের অবস্থান পরিষ্কার—তারা ডেনমার্কের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন চায়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না।

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা। গ্রিনল্যান্ড পরিচালনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও খনিজ উত্তোলনে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাৎক্ষণিকভাবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক কোনো প্রকল্প নয়। বরং সহযোগিতামূলক চুক্তির মাধ্যমে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে কাজ করাই বেশি বাস্তবসম্মত।

গ্রিনল্যান্ড কাদের সঙ্গে থাকা উচিত?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। আন্তর্জাতিক ন্যায়ের দৃষ্টিতে তাদেরই ঠিক করার কথা, তারা স্বাধীন হবে, ডেনমার্কের সঙ্গে থাকবে নাকি অন্য কোনো কাঠামোয় যাবে।

যুক্তিসঙ্গত পথ হতে পারে:

১) ডেনমার্কের সঙ্গে বর্তমান সম্পর্ক বজায় রেখে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।

২) যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ন্যাটোর সঙ্গে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা, কিন্তু সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা।

৩) আর্কটিক অঞ্চলে একটি বহুপাক্ষিক সহযোগিতামূলক কাঠামোর অংশ হওয়া, যেখানে কোনো একক শক্তি আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না।

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড-আগ্রহ একদিকে রাজনৈতিক নাটক, অন্যদিকে ভবিষ্যতের ভূরাজনীতির আভাস। এটি দেখিয়ে দেয়, আগামী দিনে আর্কটিক অঞ্চল হবে পরবর্তী বড় শক্তি প্রতিযোগিতার মঞ্চ যেখানে সম্পদ, নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তার একসঙ্গে জড়িয়ে যাবে।

তবে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে বলা যায়, গ্রিনল্যান্ড দখলের চিন্তা যুক্তিসঙ্গত নয়, বৈধ নয় এবং কূটনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। এটি হয়তো শিরোনাম বানাতে ভালো, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন, মিত্রতার রাজনীতি ও স্থানীয় জনগণের ইচ্ছার সামনে এই পরিকল্পনা টিকবে না।

শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড কোনো শক্তির “সম্পত্তি” নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর ভূমি, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ। আধুনিক বিশ্ব রাজনীতিতে প্রকৃত শক্তি দখলে নয়, বরং সহযোগিতায় এ সত্য যত দ্রুত বড় শক্তিগুলো বুঝবে, ততই আর্কটিক অঞ্চলে সংঘাতের ঝুঁকি কমবে।

লেখক : সংবাদকর্মী এবং ভু-রাজনৈতিক বিশ্লেষক

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *