দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আকস্মিক নেতৃত্ব পরিবর্তনে অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গেজেট জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক–এর গভর্নর আহসান এইচ মনসুর–এর চার বছরের মেয়াদের অবশিষ্ট অংশ বাতিল করেছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংক সদরদপ্তর ত্যাগ করার সময় সাংবাদিকদের আহসান এইচ মনসুর বলেন, তিনি পদত্যাগ করেননি; সংবাদমাধ্যমের খবর থেকেই বিষয়টি জেনেছেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তার মেয়াদ বাতিলের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। তিনি ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নারায়ণগঞ্জভিত্তিক একটি সোয়েটার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি পেশায় হিসাববিদ এবং এর আগে ব্যাংকিং খাতে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সূত্রমতে তাঁর প্রতিষ্ঠানটি মাত্র কয়েক মাস আগে ৮৯ কোটি ২ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এ প্রেক্ষাপটে নতুন নিয়োগ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তিনি অর্থনীতিবিদ নন, ব্যাংকারও নন যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার মৌলিক পূর্বশর্তগুলোর একটি। ব্যাংকিং বা আর্থিক খাতেও তার পূর্ব অভিজ্ঞতাও নেই।
শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় এ নিয়োগ আর্থিক খাতে এখন সব চেয়ে আলোচিত বিষয়।
দায়িত্ব নেওয়ার সময় আহসান এইচ মনসুরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি। দায়িত্বকালীন সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয় বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে দেখা গেছে। একই সঙ্গে আমদানি বিধিনিষেধ শিথিলকরণ, বকেয়া পরিশোধ এবং মুদ্রাবাজারকে অধিক বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, বর্তমানে যা প্রায় ১২২ টাকার আশেপাশে অবস্থান করছে। মূল্যস্ফীতিও পূর্বের দ্বিগুণ অঙ্কের ঘর থেকে কমে ৮ শতাংশে নেমে এসেছে বলে সরকারি তথ্য বলছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ একাধিক কিস্তি পেয়েছে। নতুন নেতৃত্বের অধীনে এই কর্মসূচির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা কী হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈদেশিক ঋণচাপের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন গভর্নরের অধীনে মুদ্রানীতি ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা কীভাবে পরিচালিত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
