জালিয়াতি-অনিয়ম: দামোদরপুর ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বরখাস্ত

গাইবান্ধা প্রতিনিধি :

3 Min Read
চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি-অনিয়মের প্রমাণে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ৩নং দামোদরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্তে উঠে আসে, গত এক বছরে একই ব্যক্তিকে একাধিকবার পিতা-মাতা দেখিয়ে মোট ২০টি ভুয়া জন্ম নিবন্ধন সনদ ইস্যু করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এই প্রমাণের ভিত্তিতে চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, ইউপি-১ শাখা এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। উপসচিব মো. নুরে আলম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম (নিবন্ধক) অবৈধভাবে ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড হস্তান্তর করে আইনবিরোধী কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন, যা BDRIS সিস্টেমের নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, চেয়ারম্যানের এই কর্মকাণ্ড ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতা প্রয়োগকে প্রশাসনিকভাবে আইনবিরুদ্ধ করেছে এবং জনস্বার্থের পরিপন্থী। তাই স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন অনুযায়ী তাকে স্বীয় পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এর আগে, গত ১৩ জুলাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম চেয়ারম্যান ও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধক জাহাঙ্গীর আলমের ক্ষমতা প্রত্যাহার করেন। একই সময়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান আকন্দের নিবন্ধন সহকারীর দায়িত্বও বাতিল হয়। বর্তমানে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্ব পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. সালাহউদ্দিন পালন করছেন।

তদন্তে দেখা গেছে, অনলাইন জন্ম নিবন্ধন বহিতে একই ব্যক্তিকে একাধিকবার পিতা-মাতা দেখিয়ে সনদ ইস্যু করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রুমি বেগমকে ১১টি এবং রবিউল হাসানকে ৯টি জন্ম সনদে যথাক্রমে মাতা ও পিতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ৩১ মে রুমি বেগম–বাদশা মিয়া দম্পতিকে পিতা-মাতা দেখিয়ে ৭টি, রুমি বেগম–বজলু মিয়াকে পিতা-মাতা দেখিয়ে ৪টি এবং ২০২৪ সালের ১৪ মে রবিউল হাসানকে পিতা দেখিয়ে ৯টি সনদ ইস্যু করা হয়েছিল। এসব সনদ পরবর্তীতে তদন্তে ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে।

শুধু জন্ম নিবন্ধনই নয়। অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের নামে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুল লতিফ তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি উল্লেখ করে একটি লিখিত অভিযোগ ইউএনও বরাবরে জমা দিয়েছেন। অথচ অভিযোগটি আজও তদন্তের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরখাস্ত জাহাঙ্গীর আলম স্থানীয়ভাবে নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট দলের নেতা ও দামোদরপুর ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়ক ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসন ও অন্যান্য প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি চালিয়েছেন। এলাকা ভিত্তিক কয়েকজনের সঙ্গে সখ্যতা করে চেয়ারম্যান নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। তার দুর্নীতি ও অনিয়মের কর্মকাণ্ডে এলাকায় ক্ষোভ ও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

এরইমধ্যে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয়রা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। সরেজমিন অনুসন্ধানে বিভিন্ন প্রকল্পের নয়ছয় ও দুর্নীতির অভিযোগ এবং ভুক্তভোগীদের তথ্য-প্রমাণ ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে প্রতিবেদকের হাতে আসে।

স্থানীয়রা বলছেন, তার অধীনে উন্নয়ন বরাদ্দে নয়ছয় ও প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি, অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। তাই তারা প্রশাসনের কাছে সরেজমিন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। বরাদ্দ, বিতরণ ও প্রকল্পের নথি যাচাই করলে সকল অনিয়ম, দুর্নীতি ও নয়ছয়ের তথ্য প্রমাণ পাওয়া যাবে।

- Advertisement -

তবে বরখাস্ত ও অভিযোগ বিষয়ে জানতে জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

উল্লেখ্য, দুর্নীতিতে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। চেয়ারম্যান হওয়ার আগে তিনি একটি বাড়ি ও খামার প্রকল্পের মাঠকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাটে জড়িত ছিলেন। তখন প্রমাণিত দুর্নীতির কারণে বরখাস্ত হন এবং পরে আত্মসাত করা অর্থ ফেরত দিয়েছেন।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *