ডিএনসিতে প্রভাব, সিন্ডিকেট ও বিতর্ক: রাহুল সেনকে ঘিরে যত অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি :

8 Min Read
রাহুল সেন

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বঙ্গবন্ধু পরিষদের দপ্তর সম্পাদক ও সহকারী পরিচালক রাহুল সেনকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক দানা বাঁধছে। অভিযোগ রয়েছে, পতিত হাসিনা সরকারের সময়ে তিনি ছিলেন অধিদপ্তরের অন্যতম প্রভাবশালী কর্মকর্তা। রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার পাশাপাশি টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

সাম্প্রতিক সময়ে পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু নতুন বিতর্ক। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে পঞ্চগড় জেলা কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত না করার ঘটনা নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। একই সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের সময় কর্মচারীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া পঞ্চগড়ে কর্মস্থলে অভিযানকালে প্রায় দুই হাজার পিস ট্যাপেনডাটল ট্যাবলেট উদ্ধারের ঘটনায় জব্দ তালিকায় মাত্র আড়াইশ’ পিস দেখানোর মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি আলামত গোপন ও জব্দ প্রক্রিয়ায় কারসাজির একটি উদাহরণ।

এর আগে ঢাকায় কর্মরত থাকাকালে রাহুল সেনের বিরুদ্ধে একাধিকবার আলামত বিক্রির অভিযোগ উঠলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তিনি বহাল তবিয়তে ছিলেন বলে অভিযোগ করছেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকার পরিবর্তনের পরও রাহুল সেনের ভূমিকা নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে। পঞ্চগড় মাদক দব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অফিসে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত না করলে তা নিয়েও বেশ গুঞ্জন শুরু হয় অধিদপ্তরে।

কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি অংশের সাথে কথা বলে প্রতিবেদকের হাতে আসে একটি হোয়াটস এ্যাপ স্ক্রিনশট, অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো নর্থ হোয়াটস এ্যাপ গ্রুপের এ্যাডমিন ছিলেন রাহুল, গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে গ্রুপে রাহুল সেন লিখেন ” সবাইকে বাসায় থাকার অনুরোধ করা হলো, আপনাদের পরিবার ছাড়া ও আত্নীয়দের অনুরোধ করবেন ঘর থেকে বের হয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাতে সামিল না হয়”

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক না জানানোর গুঞ্জন ও গণঅভ্যুত্থান বিরোধী অবস্থানের জন্য একসময় প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত এই সহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধে এখন প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী।

সাম্প্রতিক শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম কীভাবে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন—তা খতিয়ে দেখতে গিয়ে প্রতিবেদকের হাতে আসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

তথ্য অনুযায়ী, রাহুল সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এই রাজনৈতিক পরিচয়ের সূত্র ধরেই তিনি চাকরিতে সুপারিশ পান। চাকরিতে যোগদানের পর সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নজরে আসেন রাহুল সেন। এরপর মন্ত্রীর এপিএস মনিরকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভেতরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।

- Advertisement -
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিজ্ঞাপনচিত্র, ছবি – ভিডিও থেকে।

রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে রাহুল সেনের কার্যালয়ে নিয়মিত ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের নেতা-কর্মীদের যাতায়াত শুরু হয়। এসব যোগাযোগের মাধ্যমেই চাকরি, সুযোগ-সুবিধা ও বিভিন্ন কাজ বণ্টনের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ছাত্রলীগঘনিষ্ঠ এই কাজপ্রত্যাশী সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বিজ্ঞাপনচিত্রে শিল্পী ও কলাকুশলীদের নির্বাচনেও এই সিন্ডিকেটের প্রভাব ছিল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২৯ মার্চ ২০২৪ সালে অ্যাপল সফট নামে প্রতিষ্ঠানের কাছে আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাব চায় অধিদপ্তর এর ধারাবাহিকতায় এপ্রিলের ৫ তারিখ মূল্যায়ন কমিটির সভা হয় এবং একদিন পর তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন চিত্র নির্মাণ, মূল্যায়ন বা কার্যাদেশ দেওয়া এ সময়ে ঢাকা মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করতেন রাহুল ও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট।

- Advertisement -

সূত্র মতে, সে সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ আমলে নিলে তাঁর দর্শনার্থীদের তালিকা করা সম্ভব।

বঙ্গবন্ধু পরিষদ কাজে লাগিয়ে যেভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন রাহুল :

বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে কীভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভেতরে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন সহকারী পরিচালক রাহুল সেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে উঠে এসেছে তাঁর ক্ষমতা বিস্তারের পেছনের নানা তথ্য।

সূত্রগুলো জানায়, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের ধানমণ্ডি ও মনিপুরিপাড়ার বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল তৎকালীন মহাপরিচালক মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী এবং রাহুল সেনের। শুধু দাপ্তরিক নয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানগুলোতেও রাহুল সেনকে সরব উপস্থিতিতে দেখা যেত বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে রাহুল সেনের ঘনিষ্ঠতা এতটাই গভীর ছিল যে, তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মন্ত্রী ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যান। এই সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই অধিদপ্তরের ভেতরে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন রাহুল সেন।

রাহুল সেনের বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, ছবি – সংগৃহীত।

সূত্রগুলোর দাবি, সাবেক মহাপরিচালক ও সহকারী পরিচালক মিলে মাদক সংশ্লিষ্ট স্পট থেকে মাসোহারা আদায়, নিয়োগ, বদলি ও পদায়নকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়, যা অধিদপ্তরের ইতিহাসে বিরল। কেউ কেউ বলছেন, এই সিন্ডিকেট বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হওয়ায় রাহুল সেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন, পদোন্নতি ও বদলিতে বঙ্গবন্ধু পরিষদঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাহুল সেন সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী ছিলেন বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বঙ্গবন্ধু পরিষদের লুটপাটকৃত টাকা সরকারি কোষাগারে সংযুক্ত করার দাবিতে অধিদপ্তরের সামনে স্বাধীন বাংলা মাদকবিরোধী কল্যাণ সোসাইটি মানববন্ধন। ছবি – সংগৃহীত।

যত অভিযোগ :

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে সহকারী পরিচালক রাহুল সেনের বিরুদ্ধে নতুন করে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। সূত্রগুলো বলছে, তাঁর বিরুদ্ধে আলামত বিক্রির অভিযোগ একাধিকবার উঠলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সেগুলো প্রতিবারই ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।

অভ্যন্তরীণভাবে আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালে গুলশান-১ এলাকার একটি বাসায় অভিযানের সময় তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সমঝোতায় যান। সংশ্লিষ্ট মহলে এ ঘটনায় প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের গুঞ্জন দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সূত্র।

এ ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অধিদপ্তরের একটি সূত্রের দাবি, তিনি নিয়মিত মদ্যপানে অভ্যস্ত এবং কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। এসব কারণে দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ও অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বদলি ঠেকাতে উচ্চ আদালতে রিট :

স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিকবার বদলি হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে রাহুল সেন উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করার মত ঘটনারও জন্ম দিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে অনেক। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, একজন সরকারি কর্মচারীর পক্ষ থেকে এ ধরনের রিট করা শুধু দৃষ্টান্তমূলকই নয় বরং বদলি নিয়ে সরকারি কর্মচারী হিসেবে কার্যত নজিরবিহীন।

জানা যায়, রাহুল সেনকে গত বছরের ১২ মে ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে যোগদান করেন। দাপ্তরিক নথিপত্র অনুযায়ী, মাত্র সাত মাস পর গত ১৭ ডিসেম্বর তাঁকে একটি অফিস আদেশে পরবর্তী পদায়নের জন্য প্রধান কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হয়। এরপর ২৩ ডিসেম্বর তিনি প্রধান কার্যালয়ে যোগ দেন।

এর কয়েক দিনের মধ্যেই, ২৬ ডিসেম্বর জারি করা আরেকটি অফিস আদেশে রাহুল সেনকে ঠাকুরগাঁও জেলা কার্যালয়ে বদলি করে পদায়ন করা হয়। পরে ৩১ ডিসেম্বর তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাহুল সেনের বক্তব্য :

বঙ্গবন্ধু পরিষদের দপ্তর সম্পাদক হিসেবে থাকা বা কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার প্রশ্নে রাহুল সেন অস্বীকার করে বলেন, “আমি এর মধ্যে ছিলাম না এবং এমন কোনো কমিটি আছে কিনা আমি জানি না।” তিনি ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক কোনো কার্যক্রমেও জড়িত ছিলেন না বলে জানান। এছাড়া, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরোধিতায় বার্তা পাঠানোর বিষয়ে তিনি অফিসের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করেন। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করার বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন। অ্যাপল সফট, ফয়সাল করিম এবং ছাত্রলীগ সংক্রান্ত বিষয়ে রাহুল সেন বলেন, আমি জানি না।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *