ভারতের অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, গোপন সফরের মাধ্যমে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৯ মার্চ প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আড়ালে থাকা সফর সম্পন্ন হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিরেক্টর জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই)–এর প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশীদ চৌধুরী সম্প্রতি নয়াদিল্লি সফর করেন। সেখানে তিনি ভারতের শীর্ষ গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
দ্য প্রিন্টের তথ্য অনুযায়ী, সফরকালে তিনি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র) –এর প্রধান পরাগ জৈন এবং ভারতের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর. এস. রমনের সঙ্গে বৈঠক করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই প্রথম ডিজিএফআই পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা দিল্লি সফর করলেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৈঠকে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা এবং এমন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে এক দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য দেশের ক্ষতি করতে না পারে সে বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ থাকা কিছু যোগাযোগ চ্যানেল পুনরায় চালু করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন। এর কিছুদিন পরই সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ে রদবদলের অংশ হিসেবে ২৩ ফেব্রুয়ারি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশীদ চৌধুরীকে ডিজিএফআই প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দ্য প্রিন্টের মতে, দিল্লি সফরকে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বেশ কয়েকটি যোগাযোগ চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় মূলত দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মাধ্যমে সীমিত যোগাযোগ বজায় ছিল।
নতুন সরকারের সময়েও বাংলাদেশের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বর্তমানে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন, যা পররাষ্ট্রনীতিতে ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেয়। তিনি এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল গত বছরও যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন।
দ্য প্রিন্ট আরও জানায়, মেজর জেনারেল চৌধুরীর সফরটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিকিৎসাজনিত’ বলে উল্লেখ করা হলেও দিল্লির নিরাপত্তা মহলে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশে কোনো ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে তা ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে ভারত।
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর তারেক রহমানের সঙ্গে প্রায় আধা ঘণ্টা বৈঠক করেন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় শোকবার্তা পৌঁছে দেন।
এ ছাড়া তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরিকে পাঠানো হয়েছিল, যা দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
তবে দুই দেশের মধ্যে এখনও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে। ভারতের আশ্রয়ে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ছাত্র আন্দোলন দমনের ঘটনায় অনুপস্থিত অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। যদিও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ ইস্যুতে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক জিম্মি হয়ে থাকবে না।
এদিকে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নবায়নের বিষয়টিও দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পাশাপাশি গত এক বছরে উভয় দেশ একে অপরের ওপর যে অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, সেগুলোর সমাধানও প্রয়োজন।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক কর্মী শরিফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে দেশে ফেরত আনার বিষয়েও ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ করবে বাংলাদেশ। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স তাদের গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে।
– প্রিন্ট
