দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার পরও বাংলাদেশের বাম রাজনীতি আজ কার্যত প্রান্তিক। সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ বামধারার দল কোনো আসনেই জয় পায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আদর্শিক সংকট, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও কৌশলগত ব্যর্থতার কারণেই বাম রাজনীতি এখন তলানিতে।
বিভক্তি ও নেতৃত্ব সংকট
বাংলাদেশের বাম রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধারায় বিভক্ত। একই আদর্শিক ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও একাধিক দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ায় একটি শক্তিশালী বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি তারা। নেতৃত্বের প্রজন্মান্তরের ঘাটতি এবং তরুণদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থতাও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় দুই দলের বাইরে বিকল্প শক্তি গড়ে তুলতে হলে ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন ছিল, যা বাম দলগুলো করতে পারেনি। ফলে তাদের ভোটব্যাংক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে।
বাম দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও নেতৃত্বকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব তাদের শক্তিকে ক্ষয় করেছে।
জনসংযোগ ও মাঠ রাজনীতিতে দুর্বলতা
একসময় শ্রমিক ইউনিয়ন, ছাত্র রাজনীতি ও কৃষক আন্দোলনে বামদের শক্ত উপস্থিতি ছিল। কিন্তু গত এক দশকে সেই সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। শিল্পাঞ্চল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব কমেছে। তৃণমূল পর্যায়ে ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম না থাকায় সাধারণ ভোটারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বেড়েছে।
তরুণ ভোটারদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা থাকলেও বাস্তব রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে বাম দলগুলো। ফলে তাদের বক্তব্য জনমনে প্রভাব ফেলতে পারছে না।
নির্বাচনভিত্তিক রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে ধারাবাহিক মাঠ রাজনীতি জরুরি। কিন্তু আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ভোটারদের সঙ্গে তাদের সংযোগ শিথিল হয়েছে।
মেরুকরণের রাজনীতি ও কৌশলগত ভোট
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই বড় দুই রাজনৈতিক শক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। ফলে ভোটাররা অনেক সময় ‘কৌশলগত ভোটিং’-এর দিকে ঝুঁকেছেন, অর্থাৎ নিজেদের পছন্দের ছোট দলকে ভোট না দিয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঠেকাতে বড় দলকে সমর্থন দিয়েছেন।
এতে বাম দলগুলোর ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই মেরুকরণ ভাঙার মতো শক্ত রাজনৈতিক বার্তা বা সংগঠন বামদের হাতে ছিল না।
আদর্শিক সংকট ও সময়োপযোগী কর্মসূচির অভাব
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন ভাষা তৈরি হলেও বাংলাদেশের বাম দলগুলো সেই ভাষা ও কর্মসূচিকে সময়োপযোগীভাবে রূপান্তর করতে পারেনি। অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, পরিবেশ সংকট বা শ্রম অধিকার, এসব ইস্যুতে তাদের অবস্থান স্পষ্ট হলেও তা সাধারণ ভোটারের কাছে আকর্ষণীয় রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা যায়নি।
বামদের রাজনীতি অনেক সময় তাত্ত্বিক বা স্লোগাননির্ভর থেকে গেছে, যা সাধারণ ভোটারের দৈনন্দিন জীবনসংকটের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে পারেনি।
সামনে কী পথ?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাম রাজনীতি টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন আদর্শিক পুনর্গঠন, সাংগঠনিক ঐক্য এবং তরুণ নেতৃত্বের উত্থান। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও আন্দোলনভিত্তিক রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে তৃণমূলে প্রভাব বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিকল্প শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে হলে শুধু স্লোগান নয়, কার্যকর রাজনৈতিক কৌশল ও জনগণের আস্থা অর্জনের মতো বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি নিয়েই এগোতে হবে, এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
অন্যথায় ঐতিহাসিক ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বাম রাজনীতি প্রান্তিক শক্তি হিসেবেই থেকে যেতে পারে এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।
