মে মাসের প্রথম দিনটি এলেই ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হঠাৎ করে ইতিহাসের ভারে নত হয়ে পড়ে।’মে দিবস’ শ্রমিকের অধিকার, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে ওঠা এই দিনটি যেন বিশ্বজুড়ে এক অদৃশ্য সংহতির সেতু গড়ে দেয়। রক্তমাখা এক ইতিহাস থেকে উঠে আসা এই দিনের ভেতরে আছে ন্যায়বিচারের দাবি, মানুষের মর্যাদার লড়াই, এবং শ্রমের মূল্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার এক অবিচল প্রত্যয়।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে এই মহানতার আলো বাংলাদেশে এসে কতটা উজ্জ্বল থাকে?
বাংলাদেশের সকালগুলোতে, বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে, সূর্য ওঠার আগেই মানুষের ভিড় জমে। কেউ পোশাক কারখানার গেটের সামনে, কেউ নির্মাণস্থলের অর্ধসমাপ্ত ভবনের নিচে, কেউবা রিকশার হ্যান্ডেলে হাত রেখে অপেক্ষায় থাকে দিনের প্রথম যাত্রীর। এরা সবাই শ্রমিক কেউ দক্ষ, কেউ অদক্ষ; কেউ সংগঠিত, কেউ একেবারেই নিঃসঙ্গ। তাদের ঘামেই শহর জেগে ওঠে, অথচ তাদের নাম থাকে না শহরের গল্পে।
মে দিবস তাদের জন্য এক বিশেষ দিন তবু অদ্ভুতভাবে, এই বিশেষত্ব অনেক সময় কেবল শব্দের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। বক্তৃতার মঞ্চে শ্রমিকের মর্যাদা নিয়ে উচ্চারণ করা বাক্যগুলো যখন বাতাসে ভেসে যায়, তখন একই সময় কোনো এক কারখানার ভেতরে একজন শ্রমিক অতিরিক্ত সময় কাজ করে যাচ্ছেন, হয়তো নির্ধারিত মজুরির নিশ্চয়তা ছাড়াই। ইতিহাসের ‘আট ঘণ্টা কাজ’-এর দাবি আজও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে আপস করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রে শ্রমিকের অবদান অনস্বীকার্য। তৈরি পোশাক খাত থেকে শুরু করে নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি সবখানেই তাদের শ্রম জড়িয়ে আছে। দেশের উন্নয়ন পরিসংখ্যান যখন ঊর্ধ্বমুখী হয়, তখন তার অদৃশ্য ভিত্তি গড়ে ওঠে এই শ্রমজীবী মানুষের নীরব পরিশ্রমে। তবু উন্নয়নের এই ভাষ্যে তাদের উপস্থিতি অনেক সময়ই প্রান্তিক, অনেক সময়ই অনুল্লেখিত।
মে দিবসের মহানতা এখানেই এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন কেবল সংখ্যার বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনের মান, তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নও। কিন্তু সেই স্মরণ কি বছরের বাকি দিনগুলোতেও সমানভাবে টিকে থাকে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ বাস্তবতা জটিল। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশে অগ্রগতি যেমন আছে, তেমনি সীমাবদ্ধতাও রয়ে গেছে। অনেক শ্রমিক এখনও অনিশ্চয়তার ভেতর জীবন কাটান; তাদের জীবনে ‘অধিকার’ শব্দটি অনেক সময় কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে।
তবু আশা নিভে যায় না। কারণ পরিবর্তনের বীজও এই সমাজের ভেতরেই আছে। শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম সবাই মিলেই ধীরে ধীরে একটি সচেতনতা তৈরি করছে। নতুন প্রজন্মও প্রশ্ন করতে শিখছেশ্রমের মূল্য কতটা, আর সেই মূল্য কে নির্ধারণ করে?
মে দিবস তাই কেবল অতীতের একটি স্মারক নয়; এটি বর্তমানের একটি আয়না। এই আয়নায় আমরা নিজেদের দেখি আমাদের অগ্রগতি, আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের দায়বদ্ধতা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা মানে কেবল একটি শ্রেণির উন্নয়ন নয়; এটি একটি সমাজের নৈতিক অবস্থানের পরিমাপ।
শেষ পর্যন্ত, মে দিবসের মহানতা তার উদযাপনে নয়, বরং তার প্রতিফলনে। যদি এই দিনটি আমাদেরকে আরও ন্যায়ভিত্তিক, আরও মানবিক সমাজ গঠনের দিকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারে, তবেই তার অর্থ পূর্ণ হয়। অন্যথায়, এটি থেকে যায় কেবল একটি দিন, একটি তারিখ, একটি আনুষ্ঠানিকতা।
মে দিবস আমাদের সামনে প্রশ্ন রাখে আমরা কি সত্যিই শ্রমের মর্যাদা বুঝতে পেরেছি, নাকি এখনও সেই মর্যাদাকে শব্দের অলঙ্কার হিসেবেই ব্যবহার করছি?
উত্তরটি আমাদেরই খুঁজে নিতে হবে—প্রতিদিন, প্রতিটি কাজে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে।
