এ কথা আর কারো অজানা নেই যে, নেপালের জেন- জি আন্দোলন পরবর্তী সরকারে নির্বাচিত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ (Balendra Shah) একজন র্যাপার, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র। ২০২৬ সালের নির্বাচনে তার দল বড় পরিসরে ক্ষমতায় আসে এবং মাত্র ৩৫ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন বালেন্দ্র। এটি নেপালের রাজনীতিতে একটি বড় প্রজন্মগত বিবর্তন ও নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক।
১৯৯০ সালে কাঠমান্ডুতে জন্মগ্রহণ করা বালেন্দ্রের পরিবার মূলত মধেশ প্রদেশের মৈথিলি বংশোদ্ভূত । তার বাবা রাম নারায়ণ শাহ একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তিনি নেপালের আন্ডারগ্রাউন্ড হিপ-হপ বা ‘নেফপ’ (Nep-Hop) জগতের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় র্যাপার ও গীতিকার ছিলেন। তার গানে প্রায়শই দুর্নীতি, বৈষম্য ও সামাজিক অসঙ্গতি উঠে আসত। ২০২২ সালে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হয়ে বিশ্বকে চমকে দেন। ২০২৩ সালে বিখ্যাত টাইম সাময়িকী তাকে বিশ্বের ‘শীর্ষ ১০০ উদীয়মান নেতা’র তালিকায়ও স্থান দেয়।
প্রশ্ন হচ্ছে এখন পর্যন্ত কী কী পরিবর্তন বালেন্দ্র এনেছে দেশের রাজনীতিতে?
ইতিমধ্যেই সরকার ভিআইপি কালচার কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে এবং প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানোর লক্ষ্য হাতে নিয়েছে। এছাড়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান সত্যিই প্রশংসনীয়। বর্তমান সরকার ২০২৫ সালের বিক্ষোভ-সহিংসতার তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার পাশাপাশি সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়াও শুরু করেছে।
সামাজিক সংস্কার ও প্রশাসনিক আধুনিকায়নে জোর দিয়ে নতুন সরকার ১০০ দফা সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্রি -ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, সরকারি সেবা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করা, নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে চাপমুক্ত করার মতো উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কাঠামোগত সংস্কারকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে তরুণদের বিদেশমুখী প্রবণতা কমিয়ে দেশে সুযোগ বাড়ানোর কৌশল নিয়েও কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে ছোট আকারের মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে এবং প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত সেবা প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য সব খাতে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা।
নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমেই বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। একসঙ্গে ১৭টি দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠককে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ভারত ও চীনের মতো বড় শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রচেষ্টাও ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
নেপালের জেন-জি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের উত্থানকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও এর কার্যকারিতা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও পুরোনো দলগুলোর বাইরে নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রতি তরুণদের ব্যাপক সমর্থন থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি বেশ জটিল। অতিরিক্ত জন-প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক চাপ ও বেকারত্ব মোকাবিলার মতো বড় চ্যালেঞ্জ এই স্বল্প অভিজ্ঞ সরকারকে সামলাতে হচ্ছে। ফলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি যতটা শক্তিশালী, তার বাস্তব প্রয়োগ ও ফলাফল এখনো পরীক্ষাধীন পর্যায়েই রয়েছে।
উল্লেখ্য, নেপালের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের রদবদলের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে গ্রেপ্তার করে পরে আদালতের নির্দেশে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন ও ২০২৫ সালের গণবিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটে।
২০২৬ সালের ২৮ মার্চ সকালে নিজ বাসভবন থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি এবং একইদিন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি ও বেকারত্ববিরোধী ‘জেন-জি’ আন্দোলন দমনে পুলিশের গুলিতে অন্তত ৭৭ জন নিহত হন। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গ্রেপ্তারের পর ৭৪ বছর বয়সী কে পি শর্মা অলিকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানেই তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
তবে ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে দুই সাবেক শীর্ষ নেতাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়। আদালতের শর্ত অনুযায়ী, তদন্ত চলাকালে প্রয়োজন হলে তাদের হাজির হতে হবে।
এদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবে আরও কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, আর সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী দীপক খাড়কা ইতোমধ্যে অর্থপাচার মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন।
