উইলিয়াম কনলি থেকে কমনওয়েলথ পুলিশ: রাজনীতিতে ডিম নিক্ষেপের গল্প

বিশেষ প্রতিনিধি :

4 Min Read
সাম্প্রতি আমেরিকায় এনসিপি নেতা আকতার হোসেনের ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়- সংগৃহীত ছবি।

আধুনিক বিশ্বের রাজনীতিতে ডিম নিক্ষেপ বা ‘এগিং’ রাজনৈতিক প্রতিবাদের দীর্ঘ ও সম্মানজনক রীতি। এটি ১৫০০ শতক থেকে শুরু হয়ে আজও বৈশ্বিক রাজনীতিতে জনতার ক্ষোভ প্রকাশের একটি সস্তা, সহজলভ্য এবং নিরাপদ উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইতিহাসে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা বহু প্রাচীন। ইংল্যান্ডে ১৬০০ শতকে নাট্যদলের খারাপ অভিনেতাদের ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হত। রোমান সাম্রাজ্যে ৬৩ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর ভেসপাশিয়ান টার্নিপ দিয়ে আক্রমণের শিকার হন। পরবর্তী শতকে রাজনীতিবিদ ও অপরাধীদের ওপরও এই রীতি ব্যবহৃত হয়েছে।

কমনওয়েলথ পুলিশ ফোর্সের জন্ম

ডিম নিক্ষেপের প্রভাব এমনকি অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ বাহিনী গঠনেও দেখা যায়। ১৯৫২ সালে কুইন্সল্যান্ডে দুই ভাই প্যাট ও বার্ট ব্রসনান প্রাইম মিনিস্টার বিলি হিউজ-এর ওপর ডিম নিক্ষেপ করেন। ঘটনার পর হিউজের সমর্থকরা ব্রসনানদের ধাক্কা দিয়ে স্টেশন থেকে বের করে দেন। প্যাট পরে জানান, তিনি শুধুমাত্র বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিরোধিতা করার জন্য ডিম নিক্ষেপ করেছিলেন।

এই ঘটনার ফলস্বরূপ অস্ট্রেলিয়ায় কমনওয়েলথ পুলিশ ফোর্স (বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ) গঠিত হয়, যা বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হয়।

উইলিয়াম “এগ বয়” কনলি

ডিম নিক্ষেপের ইতিহাসে সর্বশেষ আলোচিত ঘটনা হলো ২০১৯ সালের উইলিয়াম কনলি-এর ঘটনা। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে একটি মসজিদে হামলার পর অস্ট্রেলিয়ার চরমপন্থী রাজনীতিবিদ ফ্রেজার অ্যানিং মুসলিমদের দোষারোপ করলে, কনলি তার মাথায় ডিম নিক্ষেপ করেন।

ঘটনা মুহূর্তেই সামাজিক ও সংবাদমাধ্যমে ভাইরাল হয়। অ্যানিং কিশোরের প্রতি প্রতিক্রিয়ায় দুইবার আঘাত করলেও, জনমত পুরোপুরি কনলির পক্ষে থাকে। কনলির আইনি খরচ এবং আরও ডিম সংগ্রহের জন্য GoFundMe চালু হয়, যেখানে ৩,০০০-এর বেশি মানুষ ৬৩,০০০ ডলারের বেশি দান করেন। কনলি পরে জানিয়েছেন, দানের বড় অংশ মসজিদ হামলার ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য ব্যবহার করা হবে।

আধুনিক যুগে ডিম নিক্ষেপের কিছু ঘটনা

- Advertisement -

২০১০: ভবিষ্যৎ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ১৬ বছর বয়সী এক ছাত্রের ডিম নিক্ষেপের শিকার।

যুক্তরাজ্য: এড মিলিব্যান্ড ও ইউকিপ নেতা নাইজেল ফারাজ একাধিকবার ডিম নিক্ষেপের শিকার।

২০১৯: জেরেমি করবিন লন্ডনের ফিন্সবেরি পার্ক মসজিদে ডিম নিক্ষেপের শিকার।

- Advertisement -

২০০১: সাবেক ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার জন প্রেস্কট উত্তর ওয়েলসে প্রচার অভিযানের সময় ডিমে আঘাত পান।

জার্মানি ও ফ্রান্স: চ্যান্সেলর হেলমুট কোল ও অর্থমন্ত্রী এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ডিম নিক্ষেপের শিকার।

আমেরিকা ও ব্রাজিল: রিচার্ড নিকসন, বিল ক্লিনটন এবং মারিয়া ভিক্টোরিয়া বারোসকে ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে ডিম নিক্ষেপ

নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিনিধি দলের সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেনের ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছে। ঘটনায় অংশ নিয়েছে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুক্তরাষ্ট্র শাখার নেতাকর্মীরা।

বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাত একটার সময় জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৮ নম্বর টার্মিনালে এই ঘটনা ঘটে।

এছাড়া, হাসিনা সরকার পতনের পরে গ্রেফতার হওয়া কয়েকজন আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রীর ওপর আদালত চত্বরে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।

আমেরিকায় আইনি প্রভাব

আমেরিকায় রাজনীতিবিদ বা সাধারণ মানুষের ওপর ডিম নিক্ষেপ করা অপরাধ, যা শারীরিক হামলা, সম্পত্তি ধ্বংস বা অশান্তিকর আচরণ হিসেবে গণ্য হয়। আহত হলে এটি Assault বা Battery, সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে Vandalism, এবং জনসমক্ষে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে Disorderly Conduct হিসেবে দেখা হয়। যদিও এটি কখনো প্রতিবাদের রূপে ব্যবহৃত হয়, আইনের দৃষ্টিতে এটি দণ্ডনীয় কাজ।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *