সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক ও ওপেক প্লাস জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। প্রায় ছয় দশক ধরে সমন্বিত উৎপাদন নীতির অংশ থাকার পর ২০২৬ সালের ১ মে থেকে জোট ছাড়ছে দেশটি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ১৯৬৭ সালে আবুধাবির মাধ্যমে ওপেকে যোগ দেয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে দেশটির ফেডারেশন গঠনের পরও এটি সংগঠনটির সদস্য হিসেবে থেকে যায়। দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান তেল উৎপাদকদের সঙ্গে সমন্বয় করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছিল দেশটি।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যেখানে আমিরাতসহ ওপেকভুক্ত দেশগুলোর উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
দেশটির জ্বালানি মন্ত্রী সুহাইল মোহাম্মদ আল-মাজরুয়ী রয়টার্সকে জানিয়েছেন, উৎপাদনের মাত্রা ও ভবিষ্যৎ নীতিমালা গভীরভাবে পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণভাবে স্বাধীনভাবে গৃহীত একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত।
১. কোটা ব্যবস্থার অবসান
ওপেক ছাড়ার ফলে আমিরাত আর উৎপাদন কোটার বাধ্যবাধকতায় থাকবে না। এতদিন জোটের নির্ধারিত সীমার মধ্যে তেল উত্তোলন করতে হতো। এখন দেশটি নিজস্ব সক্ষমতা ও বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী উৎপাদন নির্ধারণ করতে পারবে। আমিরাত ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩৪ লাখ ব্যারেল থেকে বাড়িয়ে ৫০ লাখ ব্যারেলে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
২. সরবরাহ সিদ্ধান্তে বাড়বে স্বাধীনতা
জোটের বাইরে থাকায় অন্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই উৎপাদন বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ পাবে আমিরাত। সরকার জানিয়েছে, বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ধাপে ধাপে অতিরিক্ত সরবরাহ বাড়ানো হবে।
৩. সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা হ্রাস
বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ওপেক ও ওপেক প্লাস। আমিরাতের মতো বড় উৎপাদক দেশ জোট ছাড়লে সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা কমবে, যা বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে এর প্রভাব সীমিত থাকতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
৪. জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য
আমিরাত অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণের পথে এগোচ্ছে। বর্তমানে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৭৫ শতাংশই অ-তেল খাত থেকে আসে। একই সঙ্গে তেল-গ্যাসের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য ও স্বল্প-কার্বন জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওপেকের সীমাবদ্ধতা না থাকলে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হতে পারে।
৫. আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়াও এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রভাব ফেলেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু উৎপাদন নয়, বরং তেল পরিবহনই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে কাতারও ওপেক ছাড়ে, যদিও উপসাগরীয় কিছু দেশ জোটের বাইরে থেকেও সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয় রাখছে।
যদিও আমিরাত জানিয়েছে, ওপেকের বাইরে থেকেও তারা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে এবং উৎপাদক ও ভোক্তা দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
গালফ নিউজ
