বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি, বিনা অভিজ্ঞতায় কর্মসংস্থান কিংবা অল্প সময়ের মধ্যে ভিসা পাওয়ার আশ্বাস—এ ধরনের আকর্ষণীয় প্রচারণা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া এসব ভিডিও ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রান্তিক মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালচক্র আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে প্রতারণার নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে।
অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রতারণার ধরন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পিত ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। এখন শুধু মুখে আশ্বাস নয়, বরং ভুয়া নিয়োগপত্র, জাল ভিসা, নকল বিমান টিকিট, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জাল চুক্তিপত্র, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভিডিও ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশের নামী প্রতিষ্ঠানের লোগো ও সরকারি সংস্থার নাম ব্যবহার করে এমনভাবে প্রচারণা চালানো হয়, যাতে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতারকরা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করে। সেখানে মাসিক মোটা বেতন, বিনা খরচে আবাসন, চিকিৎসা সুবিধা এবং দ্রুত ভিসা পাওয়ার মতো নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। আগ্রহীরা যোগাযোগ করলে তাদের বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে আলাদা গ্রুপে যুক্ত করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে নিবন্ধন ফি, মেডিকেল ফি, প্রসেসিং চার্জ, ভিসা ফি, বিমান টিকিটসহ বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায় করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের কাছে এমন কাগজপত্র পাঠানো হয়, যা দেখতে সম্পূর্ণ আসল মনে হয়। বিদেশি কোম্পানির লেটারহেড, দূতাবাসের সিল, সরকারি অনুমোদনের কপি কিংবা বিএমইটির অনুমোদনের দাবিও করা হয়। কিন্তু যাচাই করলে দেখা যায়, অধিকাংশ নথিই জাল অথবা সম্পাদিত।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতারণার প্রধান লক্ষ্য থাকেন গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ। বিদেশে চাকরি পেলে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে—এই আশায় অনেকে জমি বিক্রি করেন, গবাদিপশু বিক্রি করেন কিংবা উচ্চ সুদে ঋণ নেন। পরে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারলেও অনেকেই সামাজিক সম্মান বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অভিযোগ করেন না।
রিক্রুটিং খাতের কয়েকজন উদ্যোক্তা বলেন, কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের কারণে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা বলেন, সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা নিয়মিত প্রচার এবং লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া বিজ্ঞাপন ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও দ্রুত অপসারণে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির ডিজিটাল ডাটাবেজ সহজলভ্য করা, বিদেশে চাকরির অফার যাচাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় অনলাইন ব্যবস্থা চালু করা এবং প্রতিটি জেলায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তাদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিদেশে যাওয়ার আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, চাকরির চুক্তি এবং সরকারি অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো অবস্থাতেই শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও বা বিজ্ঞাপন দেখে অর্থ লেনদেন করা উচিত নয়।
অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। প্রতি বছর বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান, তা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু প্রতারণার ঘটনা বাড়তে থাকলে বিদেশে কর্মসংস্থান নিয়ে মানুষের আস্থা কমবে এবং বৈধ জনশক্তি রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই সংশ্লিষ্টদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচালিত প্রতারণা শনাক্তে বিশেষ সাইবার মনিটরিং সেল গঠন, ভুয়া প্রচারণার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা, লাইসেন্সবিহীন দালাল ও এজেন্সির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান এবং ভুক্তভোগীদের জন্য সহজ অভিযোগ গ্রহণ ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তাদের মতে, কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
