রাজধানীর গুলিস্তানের বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য নির্মাণাধীন নতুন মার্কেটে দোকান বরাদ্দকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্ধারিত কিস্তির বাইরে প্রতি দফায় দোকান মালিক সমিতি আরও ১০ হাজার টাকা করে নিচ্ছে। তবে এই অর্থ কোন খাতে নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাচ্ছেন না তারা।
২০২৩ সালের এপ্রিলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় বঙ্গবাজার সুপার মার্কেট। পরে সেখানে আধুনিক বহুতল কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ডিএসসিসি। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাঁচ কিস্তিতে মোট ১৫ লাখ টাকা অগ্রিম সালামি পরিশোধের মাধ্যমে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিটি কিস্তির পরিমাণ ৩ লাখ টাকা।
তবে একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, ডিএসসিসির নামে ৩ লাখ টাকার পে-অর্ডার করার পাশাপাশি দোকান মালিক সমিতিকে নগদ আরও ১০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। পে-অর্ডারের রসিদও সমিতির কার্যালয়ে জমা নেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আদর্শ হকার্স মার্কেটের এক ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিক বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর ব্যবসা হারিয়ে তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। গ্রামের জমি বিক্রি করে কিস্তির টাকা জোগাড় করতে হচ্ছে। তার ভাষ্য, ‘দুই কিস্তি দিয়েছি। কিন্তু প্রতি কিস্তিতে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা কেন দিতে হচ্ছে, কেউ পরিষ্কার করে বলতে পারেনি।’
ডিএসসিসির তথ্য অনুযায়ী, নতুন কমপ্লেক্সে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য মোট ২ হাজার ৯৬১টি দোকান বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি দোকান থেকে পাঁচ কিস্তিতে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা করে আদায় করা হলে মোট আদায়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
কীভাবে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা
ব্যবসায়ীরা জানান, ডিএসসিসির নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত অর্থের পে-অর্ডার তৈরি করে তারা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত দপ্তরে যান। তবে সেখানে পে-অর্ডারের স্লিপ গ্রহণ না করে দোকান মালিক সমিতির কার্যালয়ে জমা দিতে বলা হয়। স্লিপ জমা দেওয়ার সময়ই অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাদের।
মহানগরী হকার্স মার্কেটের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের অফিস থেকে আমাদের সমিতির অফিসে পাঠানো হয়। সেখানে স্লিপ জমা দেওয়ার সময় ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।’
ডিএসসিসির চিঠি
জানা গেছে, ডিএসসিসি সম্প্রতি বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পাঠানো এক চিঠিতে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৯৬১ জন ব্যবসায়ীকে তৃতীয় কিস্তির ৩ লাখ টাকা অগ্রিম সালামি পরিশোধের নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে যাঁরা দ্বিতীয় কিস্তি পরিশোধ করেননি, তাঁদের একসঙ্গে ৬ লাখ টাকা জমা দিতে বলা হয়।
সে অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের পে-অর্ডারের মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হলেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সামনে এসেছে।
সমিতির ব্যাখ্যা
দোকান মালিক সমিতির এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অফিস পরিচালনা, ভাড়া ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে এই অর্থ নেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য, ‘অনেক জায়গায় অনেক ধরনের খরচ থাকে। সেগুলো ম্যানেজ করার জন্য পে-অর্ডারের বাইরেও কিছু টাকা নিতে হয়।’
তবে এসব খরচের কোনো লিখিত হিসাব বা অনুমোদনের বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি।
বক্তব্য মেলেনি
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে দোকান মালিক সমিতির কার্যালয়ে গেলে জানানো হয়, সাধারণ সম্পাদক মীর আল মামুন বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে, পে-অর্ডারের স্লিপ সমিতির কাছে জমা দেওয়ার বিষয়ে জানতে ডিএসসিসির দেওয়া যোগাযোগ নম্বরে ফোন করলে অফিস সহকারী মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়ে তাঁর জানা নেই।
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
নির্মাণাধীন নতুন কমপ্লেক্স
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, নির্মাণাধীন বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে একটি বেজমেন্ট, গ্রাউন্ড ফ্লোর এবং আটটি তলা থাকবে। গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ৪২টি দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য ২ হাজার ৯৬১টি দোকান বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নতুন ভবনে আগের তুলনায় ৮১টি দোকান বেশি থাকবে এবং প্রতিটি দোকানের আয়তন হবে ৮০ থেকে ১০০ বর্গফুট।
২০২৪ সালের মে মাসে ভবন নির্মাণকাজ শুরু হলেও ওই বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কাজ কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আবারও নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে দোকান বরাদ্দ প্রক্রিয়াকে ঘিরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ নতুন করে অসন্তোষ তৈরি করেছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
