২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার অবশেষে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নবনির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে তাদের দেড় বছরের অধ্যায়ের সমাপ্তি টানছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সরকারটির নেতৃত্ব দেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস। দায়িত্ব নেওয়ার সময় রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল নানামুখী সংকটে ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসন, আস্থাহীন নির্বাচন ব্যবস্থা এবং তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন।
১৮ মাসের এই সময়কালজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নির্বাচন আয়োজন এবং নানা বিতর্ক মিলিয়ে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে মিশ্র মূল্যায়ন সামনে এসেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সংস্কার :
দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিক ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন খাতে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৮ মাসে প্রায় ১৩০টি আইন প্রণয়ন বা সংশোধন এবং ৬০০টির বেশি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি ১১৬টি অধ্যাদেশ জারি হয়।
মোট ৫২৬টি নীতিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে ৪৩৯টি বাস্তবায়িত হয়েছে বাস্তবায়ন হার প্রায় ৮৩.৪৬ শতাংশ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে পুনর্গঠন এবং পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় তথ্যপ্রকাশের স্বাধীনতা এসব পদক্ষেপকে সরকার কাঠামোগত অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরেছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, ভঙ্গুর অর্থনীতি ও দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করে সরকার ‘৯০ শতাংশ সফল’ হয়েছে।
অর্থনীতি: স্থিতিশীলতার দাবি, চাপের বাস্তবতা :
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। দেড় বছর পর অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্স ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং রপ্তানিতে প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। রাজস্ব বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ খাতে অপচয় কমানো এবং ব্যাংকিং তদারকি জোরদারের কথাও বলা হয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগ ছিল। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮.৭৭ শতাংশের আশেপাশে ছিল। শিল্প খাতে স্থবিরতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতা নিয়েও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সমালোচনা রয়েছে।
১৮ মাসে আইনশৃঙ্খলা :
২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার সময় অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার করা। সরকার পরিবর্তনের পর বহু থানা কার্যত পুলিশশূন্য হয়ে পড়ে, জনমনে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা। সেনাবাহিনীর সহায়তায় ধাপে ধাপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেয় প্রশাসন।
দেড় বছরে আইনশৃঙ্খলা খাতে একাধিক সংস্কার আনা হয়। ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ প্রণয়ন করে বাহিনীকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করার চেষ্টা করা হয়। গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি করা হয়। পূর্ববর্তী সময়ের গুমের অভিযোগ তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিশন গঠন করা হয়, যেখানে ১,৮৫০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়ে। বিতর্কিত সাইবার আইন বাতিল করে নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়নও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি সমালোচনাও ছিল প্রবল। ২০২৪ সালের শেষার্ধে ডাকাতি, ছিনতাই ও রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বাড়ার তথ্য সামনে আসে। বিভিন্ন মাজার ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলে। যদিও সরকার দাবি করেছে, নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বড় ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা এড়ানো তাদের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
সব মিলিয়ে ১৮ মাসের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের প্রচেষ্টা এবং চলমান সংকটের এক মিশ্র বাস্তবতা যেখানে তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা এলেও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা :
সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচনাও ছিল স্পষ্ট। একনেক অনুমোদিত নতুন প্রকল্পে আঞ্চলিক বরাদ্দ বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগে ৪২ শতাংশ বরাদ্দের বিপরীতে রংপুর বিভাগে মাত্র ২.৪৪ শতাংশ বরাদ্দ পাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি, কৃষি খাতের ধীরগতি এবং শিল্পোৎপাদনে স্থবিরতা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি পুরোপুরি কমাতে পারেনি।
বিশ্লেষকরা সরকারের কর্মকাণ্ডকে আংশিক সফল হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম বলেন, জাতীয় ঐকমত্য গঠন এবং নির্বাচন আয়োজন সরকারের বড় অর্জন।
অন্যদিকে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বিদেশি বিনিয়োগ ও কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম জানান, খাদ্য মজুদ বাড়লেও কৃষি উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং বাজার অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে সরকার পুরোপুরি সফল হয়নি।
ইউনূসের কর সুবিধা, লাইসেন্স ও নিয়োগ বিতর্ক:
২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার গ্রামীণ ব্যাংককে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সব ধরনের আয়কর থেকে অব্যাহতি দেয়, যা সমালোচকদের কাছে স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখা হয়েছে। যদিও এনবিআর জানিয়েছে, অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানও এই সুবিধা পায়। একই সময়ে ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠান ‘গ্রামীণ কল্যাণ’-এর ৬৬৬ কোটি টাকার কর ফাঁকির মামলায় হাইকোর্ট আগের রায় বাতিল করা হয়।
সরকারি সময়ে গ্রামীণ পরিবারের নতুন উদ্যোগ যেমন ‘ গ্রামীণ ডিজিটাল ওয়ালেট’ ও ‘গ্রামীণ ম্যানপাওয়ার’ কে বাণিজ্যিক লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে এবং ব্যাংকের অংশীদারি কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ অনুমোদনকেও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
উপদেষ্টা নিয়োগ ও ব্যক্তিগত বলয় নিয়েও সমালোচনা উঠেছে। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে কোটা নিয়োগ বা আত্মীয়করণ হিসেবে দেখছে ছাত্র-জনতা, এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে গ্রামীণ নেটওয়ার্কের পরিচিতদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সরকার এসব সমালোচনাকে প্রশাসনিক সংস্কার ও পূর্ববর্তী সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক মাধ্যমের অঙ্গনে বিষয়গুলো নিয়ে তীব্র বিতর্ক এখনও চলছে।
উপদেষ্টা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ :
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদজুড়ে কয়েকজন উপদেষ্টা ও তাদের নিয়োগকৃত ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও সরকার অধিকাংশ অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছে, তবু কয়েকটি ঘটনায় তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সাবেক সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার অন্তর্বর্তী সরকারের আটজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ আনেন এবং তার কাছে প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়।
সেখ বশির উদ্দিন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় সমালোচনার মুখে পড়েন। বিশেষজ্ঞ ও বিরোধীরা এটি স্বার্থের সংঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া তার মালিকানাধীন ‘আকিজ বশির এভিয়েশন লিমিটেড’ বাণিজ্যিক হেলিকপ্টার লাইসেন্সের জন্য আবেদনও সমালোচিত হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। শিল্পকলা একাডেমি সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদের অভিযোগ, ফারুকী দাপ্তরিক নিয়ম ছাড়াই অর্থ ছাড়ের চাপ দিতেন; ফারুকী এটিকে ‘সাবেক ডিজির হতাশা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন উৎসবে ড্রোন শো এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল ও সমালোচনা হয়েছে।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সদ্য বিদায়ী পরিচালক এবং কথাসাহিত্যিক আফসানা বেগম সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুকীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। মূলত ‘বই নির্বাচনের কোটা’ এবং ‘প্রশাসনিক অসহযোগিতা’ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
এছাড়াও বিভিন্ন সময় নিয়োগ, বদলি, পদায়নসহ সরকারি টেন্ডারে নিজের গণ্ডির মানুষের কাজ দেওয়ার মত অভিযোগও শোনা যায় মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বিরুদ্ধে।
এদিকে উপদেষ্টাদের নিয়োগকৃত কয়েকজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তের আওতায় রয়েছেন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সাবেক এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সাবেক পিও তুহিন ফারাবী এবং সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের সাবেক পিএ আতিক মোর্শেদ।
আতিক মোর্শেদের বিরুদ্ধে ‘নগদ’-এর মাধ্যমে বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠে। অভিযোগের পর সংশ্লিষ্টদের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
অভিযোগগুলোর মধ্যে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং নিয়োগে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে নিয়েও বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিটিসিএল ৫-জি প্রকল্প, NEIR প্রযুক্তি বাস্তবায়ন এবং বিফট (BIFT) প্রকল্প সংশোধন সংক্রান্ত কার্যক্রম। জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার দুই দিন পর, ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব গোপনভাবে জার্মানির উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেন। তার বিদেশ যাত্রা নিয়ে প্রশ্ন উঠে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে।
এছাড়া, দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশে বিলম্ব এবং উপদেষ্টা পরিষদের অন্তত সাতজন সদস্যের বিরুদ্ধে আমলাতান্ত্রিক অনিয়মে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
উপদেষ্টার আত্মমূল্যায়ন:
দেড় বছর দায়িত্ব পালন শেষে বিদায়ের প্রাক্কালে নিজেদের কাজের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা। তারা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের অর্জন ও সীমাবদ্ধতার চিত্র তুলে ধরে সামগ্রিকভাবে নিজেদের সফল দাবি করেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যেই টেকসই উৎপাদন, সম্পদ সংরক্ষণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রান্তিক খামারিদের স্বার্থরক্ষায় একাধিক আইন, অধ্যাদেশ ও নীতিমালা প্রণয়ন বা সংশোধন করা হয়েছে। মৎস্য খাতের উন্নয়ন, পোল্ট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতে কাঠামোগত সংস্কারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি ব্যর্থতার দায় নিয়ে বিদায় নিচ্ছি না। আমাদের কাজ যথাযথভাবে পালন করেছি।
ভূমি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার জানান, তার নেতৃত্বে দুই মন্ত্রণালয়েই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশন সম্পন্ন হওয়ায় এখন ঘরে বসেই খতিয়ান, নকশা ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা যাচ্ছে। জমি রেজিস্ট্রেশনে হয়রানি কমেছে বলেও দাবি করেন তিনি। খাদ্য খাতে তিনি বলেন, গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মজুদ রেখে যাচ্ছেন তারা চাল ও গম মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ২২ লাখ টন খাদ্য মজুদ রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ নিজের কাজকে ১০০-এর মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ নম্বর দিয়ে মূল্যায়ন করেন। তিনি স্বীকার করেন, অনেক উদ্যোগ শুরু হলেও সব বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তার ভাষায়, অন্তর্বর্তী সময়ে অর্থনীতি পরিচালনা করা সহজ ছিল না। কাঠামোগত দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় লেগেছে। তবে রাজনৈতিক এজেন্ডা ছাড়াই জনগণের স্বার্থে কাজ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে ১৬ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তার মেয়াদের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন। তিনি জানান, ন্যাশনাল এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান প্রণয়ন, সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণে প্রজ্ঞাপন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২৫, জাতীয় বননীতি ২০২৫ এবং বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন খাতে ৬৯টি প্রকল্প অনুমোদনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এর মধ্যে গ্রামীণ কৃষকদের জন্য ২০০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং তিনটি উপকূলীয় জেলায় সুপেয় পানি সংরক্ষণ প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক রূপান্তর :
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন করে বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে সরকার তাদের মূল প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে।
নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন জোট। নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর একটি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা দাবি করেন, এই সময়কালে পররাষ্ট্রনীতিতে সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে এই দেড় বছর ছিল রূপান্তরের সময় আংশিক সফল, আংশিক বিতর্কিত। ইতিহাসে এই অধ্যায় মূল্যায়িত হবে প্রধানত দুটি মানদণ্ডে: গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা এবং শুরু করা সংস্কার কতটা টেকসই হলো।
