দেশে গণপরিবহন ব্যবস্থায় বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগকে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, ব্যয় কাঠামো ও সময়সীমা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর রুটে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর লক্ষ্যে ৪ হাজার ২৮৩ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া প্রস্তাবে ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথ বিদ্যুতায়নের পাশাপাশি ১৬টি ইএমইউ ট্রেন কেনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পাঁচ বছরের রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশই বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক প্রায় ২ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে জমি অধিগ্রহণ কমানো ও বাস্তবায়ন সময়সীমা পুনর্বিন্যাসের শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৬ সালের জুন পর্যন্ত, যা বিশেষজ্ঞদের মতে তুলনামূলকভাবে ছোট রুটের জন্য অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময়।
প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও জটিল হয়ে উঠছে বিদ্যমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে। ঢাকা-টঙ্গী এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর অংশে ডাবল লাইন নির্মাণ এখনো সম্পূর্ণ না হওয়ায় ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর আগে এসব কাজ শেষ করা জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৬টি ইএমইউ ট্রেন কেনায় প্রায় ১ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। পাশাপাশি কর্মশালা নির্মাণ ও বিদ্যুতায়ন অবকাঠামো মিলিয়ে বড় অঙ্কের ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও স্থানীয় দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
অর্থনৈতিকভাবে প্রকল্পটি লাভজনক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, আয়-ব্যয়ের যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত আশাবাদী। পরিচালন ব্যয় ৩৫ শতাংশ কমবে এবং যাত্রা সময় ১৮ শতাংশ হ্রাস পাবে—এমন হিসাব বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এ ছাড়া দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়মিত পরিস্থিতি, মিটার গেজ ও ব্রড গেজ রেলপথের বৈচিত্র্য এবং অবকাঠামোগত সমন্বয়ের অভাব প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখের বেশি যাত্রী উপকৃত হবেন এবং পরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। তবে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাওয়ার যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, এই প্রকল্পও সেই চক্র থেকে বের হতে পারবে কি না—এ নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
