প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি রূপরেখা হিসেবে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, কার্যকর নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ জনপ্রশাসন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সব ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম।
সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার একটি দুর্বল অর্থনীতি ও ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পেলেও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। সরকারের লক্ষ্য ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর, যেখানে বেসরকারি উদ্যোগ, উদ্ভাবন এবং কর্মসংস্থান হবে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক কৌশল ‘থ্রি-আর’—রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রিস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন—কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, দুর্নীতি, অর্থপাচার, বিনিময় হার নিয়ে কারসাজি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলা করেই সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। কৃষি, শিল্প, সেবা, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবণতার কারণে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাজস্ব আহরণ নিয়ে সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে করনীতি ও কর প্রশাসন পৃথক করা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু, কর ফাঁকি রোধ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আগামী অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ঋণ পরিস্থিতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। ঋণনির্ভরতা কমাতে ব্যাংকঋণ হ্রাস, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি, বন্ড ও ইকুইটি ফাইন্যান্সিং সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আর্থিক অপরাধ দমনে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত অগ্রাধিকারভিত্তিক ১১টি মামলায় দেশ-বিদেশে ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করা হয়েছে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আইনি সহযোগিতাও জোরদার করা হয়েছে।
ব্যাংক খাত প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের সঞ্চয় সুরক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। একই সঙ্গে অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে একাধিক কর-প্রণোদনার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে জিরো কুপন বন্ডের আয়ে কর অব্যাহতি, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য করহার কমানো, লভ্যাংশের ওপর কর হ্রাস এবং মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগে কর রেয়াতের সীমা প্রত্যাহার।
আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন শর্ত থাকায় সরকার আগের কর্মসূচি থেকে সরে এসেছে। তবে দেশের স্বার্থের অনুকূল নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী দিনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তন, রাজস্ব আহরণ ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নকে বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে বাজেট নিয়ে সংসদ সদস্য, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন ও গণমাধ্যমের গঠনমূলক মতামতের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান অর্থমন্ত্রী।
