বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে দেশের মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা থাকলেও সেই আবেগের সঙ্গে ঘটেছে বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। প্রিয় দলের সমর্থন, পতাকা টাঙানো এবং খেলা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৪৫ জন।
ঘটনাগুলোর মধ্যে তিনজন ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে মারা গেছেন তিনজন। এ ছাড়া মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধ ও শারীরিক অসুস্থতাসহ বিভিন্ন ঘটনায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্বকাপ ঘিরে সহিংসতা এড়াতে এরই মধ্যে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বড় পর্দায় খেলা দেখানোর আয়োজনগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব স্থানে বড় পর্দায় খেলা দেখানো হবে, সেখানে ডিবির সদস্যরা পর্যবেক্ষণে থাকবেন।
বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে দেশে হতাহতের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ চলাকালে এক মাসে অন্তত ১২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শ ও ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনাও ছিল। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপেও হবিগঞ্জে আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছিল।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, খেলাধুলায় জয়-পরাজয় স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে মানুষ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় তা সংঘাতে রূপ নেয়।
তিনি বলেন, শুধু খেলাধুলা নয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও ভিন্নমত মেনে নেওয়ার সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। অন্যের আবেগ ও মতামতের প্রতি সম্মান দেখানোর অভ্যাস তৈরি না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সমর্থকদের বিরোধে তিন হত্যা
বিশ্বকাপ ঘিরে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে ঢাকার আদাবরে। ব্রাজিলের জয় উদযাপনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনায় একজন নিহত হন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ ছাড়া ব্রাজিল-জাপান ম্যাচ নিয়ে বিরোধের জেরে আশুলিয়ায় নাহিদ হাসান নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। পরে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সিলেটের জকিগঞ্জে ফুটবল খেলার উল্লাসকে কেন্দ্র করে চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে আলম আহমদ নামে একজন নিহত হন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পতাকা টাঙাতে গিয়ে মৃত্যু তিনজনের
প্রিয় দলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ব্রাজিলের পতাকা টাঙানোর সময় বিদ্যুৎস্পর্শে মারা যান স্কুলছাত্র মাহিন শেখ। চট্টগ্রামের লালদীঘির পাড় এলাকায় আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে গিয়ে মারা যান রামহরি বৈষ্ণব। মানিকগঞ্জে ব্রাজিলের পতাকা টাঙানোর সময় বিদ্যুৎস্পর্শে মৃত্যু হয় ফয়সাল নামে এক তরুণের।
ফুটবল আয়োজন ও উদযাপনে আরও মৃত্যু
নড়াইল সদরে ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে মোস্তাফা কাজী নামে এক বৃদ্ধকে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রামের হালিশহরে ফুটবল মাঠের গোলপোস্ট ভেঙে মাহিদুল ইসলাম নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়।
বরগুনার তালতলীতে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের একটি প্রীতি ম্যাচের অনুশীলনের সময় স্ট্রোক করে মারা যান খোকন কর্মকার।
এর আগে ভোলার বোরহানউদ্দিনে ব্রাজিল সমর্থনে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রায় গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মো. ইসমাইল নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়।
বিশ্বকাপ ঘিরে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঠেকাতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাকে বিনোদন হিসেবেই নেওয়া উচিত। সমর্থনের আবেগ যেন কোনোভাবেই সহিংসতায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন।
