জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) প্রথম সভায় মেগা প্রকল্প পরিহারের ঘোষণা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ওই সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘এখন থেকে মেগা প্রকল্প না নিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ ছোট প্রকল্প নেয়া হবে।’ এরপর সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টাসহ অন্যান্য দায়িত্বশীলরাও একই ধরনের অবস্থান প্রকাশ করেন।
তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ঘোষণার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার একনেকে অনুমোদন দিয়েছে একাধিক মেগা প্রকল্প—যার প্রতিটির ব্যয়ই হাজার হাজার কোটি টাকা।
সর্বশেষ ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত একনেক সভায় অনুমোদন পেয়েছে ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকার ‘বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (বিটিএমআইডিপি)’। চট্টগ্রামের হালিশহরের পাশে বঙ্গোপসাগরের তীরে নির্মিতব্য এই টার্মিনাল প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হচ্ছে, বাকিটা সরকারি অর্থায়ন।
অথচ ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ নিজেই একটি অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ঋণ করে অবকাঠামো নির্মাণ সক্ষমতার প্রমাণ নয়।’ তিনি আরও সতর্ক করেছিলেন, গত তিন বছরে বৈদেশিক ঋণ দ্বিগুণ হয়ে ৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০০ বিলিয়নে পৌঁছেছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার করে ঋণ পরিশোধের চাপ আসবে।
বে টার্মিনালের পর এবার নতুন করে অন্তর্বর্তী সরকার হাত দিয়েছে আরও বড় একটি প্রকল্পে—ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ। ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. শেখ মইনউদ্দিন।
সেতু বিভাগ জানিয়েছে, এটি পিপিপি (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব) মডেলে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। প্রাথমিকভাবে জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, তারা সাড়া না দিলে কোরিয়ান বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। প্রয়োজনে সরকারি অর্থায়নের কথাও বিবেচনায় আছে।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদিত অন্যান্য বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে:
কালুরঘাট রেল কাম রোড সেতু (১১,৫৬০ কোটি টাকা) – কোরিয়া থেকে ৮১ কোটি ডলারের ঋণ নিয়ে নির্মাণ, মোংলা বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ (৪,০৬৮ কোটি টাকা), চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন (৩,৯২১ কোটি টাকা), চট্টগ্রাম উত্তর কাট্টলী স্যানিটেশন প্রকল্প (২,৭৯৭ কোটি টাকা)।
এই প্রকল্পগুলো যুক্ত হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের বেশিরভাগই এখন ২ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের।
অথচ এই সরকারই প্রণীত অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্রে তুলে ধরা হয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ৩ লাখ কোটি টাকার মতো অপচয় হয়েছে। ৭ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার এডিপির ৪০ শতাংশ পর্যন্তই লুটপাট হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য গণমাধ্যমকে বলেন,
নতুন প্রকল্পগুলোতেও যে অনিয়ম ও অপচয় হবে না তা বলা যাচ্ছে না। এখনো স্বচ্ছতার ঘাটতি আছে। আগের অতিমূল্যায়িত, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো বাদ দেয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা পরিষ্কার নয়। পুরনো ও নতুন প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা, মূল্যায়ন ও নীতিমালা নেই বললেই চলে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন তো এই সরকারের মেয়াদে হবে না। তাহলে কেন এ সরকারই এগুলো নিচ্ছে?
অন্যদিকে, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ দাবি করেছেন, মোটামুটি মেগা প্রকল্প নিচ্ছি না, বরং অনেক মেগা প্রকল্পই বাদ দিয়েছি। নতুন যেগুলো নেয়া হয়েছে, সেগুলো দূরদর্শী বিবেচনায় নেয়া।
তিনি আরও বলেন, বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে এবং আগের দায়মুক্তির লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। ‘জনতুষ্টিমূলক কিছু না করে ভবিষ্যতের দায় তৈরি না করাই আমাদের লক্ষ্য।’
তবে বাস্তবতা বলছে, আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। এর বড় অংশই যাবে মেগা প্রকল্পে। এডিপিতে মোট ১ হাজার ১৪৩টি প্রকল্প রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ সাজ্জাদ জহির মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বন্দর ও তার আশপাশের অবকাঠামোগুলোকে ‘মেগা হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার কৌশল নিয়েছে। তবে এতে ঝুঁকি রয়েছে। “এই প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে,” বলেন তিনি।
উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার মেয়াদ সীমিত এবং ক্ষমতা কার্যকর নীতিনির্ধারণে প্রশ্নবিদ্ধ। এ অবস্থায় মেগা প্রকল্প গ্রহণের ফলে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও রাজনৈতিক দায় ভবিষ্যৎ সরকার ও জনগণের উপর বর্তায়। এতে করে প্রকল্পের কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়।
