জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। গান, আলোচনা ও ফুলেল শ্রদ্ধায় বুধবার দিনভর স্মরণ করা হচ্ছে বিদ্রোহী কবিকে।
সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে নজরুলের সমাধিতে পরিবারের সদস্য, অনুরাগী, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। আয়োজিত হয় আলোচনা সভা ও সংগীতানুষ্ঠান।
কবি নজরুলের নাতনী খিলখিল কাজী বলেন, “শুধু দিবসকেন্দ্রিক স্মরণ নয়, নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে নজরুল কীভাবে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গেছেন।” তিনি নজরুল রচনাবলীর যথাযথ অনুবাদ না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, নজরুল রচনাবলী অনুবাদের ক্ষেত্রে নজরুল ইন্সটিটিউটের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, একাডেমিও কিছু কাজ করেছে, তবে মূলত নজরুল ইন্সটিটিউট এ ক্ষেত্রে ব্যাপক উদ্যোগ নিচ্ছে।
শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “নজরুলের রচনা এ দেশের মানুষের অনুপ্রেরণা। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে আজও তাঁর চেতনা আমাদের দিশা দেখায়।”
ভাষাবিদ সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, নজরুল যুগের প্রয়োজন মেটাতে লিখেছিলেন। আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা তিনি দিয়ে যাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান নজরুলের বহুমুখী প্রতিভার কথা উল্লেখ করে বলেন, “সাংবাদিক থেকে শুরু করে রণাঙ্গনের যোদ্ধা—সব ক্ষেত্রেই নজরুল ছিলেন অনন্য। বৈষম্য ও অসাম্যের বিরুদ্ধে তাঁর যে অবস্থান, সেটিই আমাদের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনার সঙ্গে মিলে যায়। এজন্য নজরুল আজও ভীষণ প্রাসঙ্গিক।”
নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমি, উদীচী, শিল্পকলা একাডেমি, নজরুলসংগীত শিল্পী সংস্থা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলসহ অসংখ্য সংগঠন তাঁর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
সমাধি প্রাঙ্গণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিল্পীরা পরিবেশন করেন নজরুলের জনপ্রিয় গান ‘বাগিচায় বুলবুলি’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’ প্রভৃতি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও এ আয়োজনে অংশ নেন।
প্রেম ও দ্রোহের কবি
১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেন নজরুল। কৈশোরে পিতৃহারা হয়ে জীবিকার তাগিদে কাজ করতে হয় কখনো মুয়াজ্জিন হিসেবে, কখনো লেটো দলে। পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অগ্নিঝরা কবিতা ‘বিদ্রোহী’, যা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নতুন প্রেরণা জোগায়। একের পর এক প্রকাশিত হয় অগ্নিবীণা, প্রলয়োল্লাস, বিষের বাঁশি, ব্যথার দান প্রভৃতি গ্রন্থ। কবিতার পাশাপাশি সংগীতেও রেখেছেন অমর স্বাক্ষর। চার হাজারের বেশি গান রচনা করেছেন তিনি—শ্যামাসংগীত, গজল, দেশাত্মবোধক গান থেকে শুরু করে প্রেম ও দ্রোহের সুরে।
১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে বাকশক্তি হারান নজরুল। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং জাতীয় কবির মর্যাদা দেন।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করে, ১৯৭৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। সে বছরই ২৯ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে।
