মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতি ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। সংস্থাটির সাম্প্রতিক ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘ হলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে।
প্রতিবেদনে বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাকে ‘অত্যন্ত নাজুক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে, চলতি বছর তেল, গ্যাস ও খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকতে পারে, এমনকি আগামী বছরও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি নাও হতে পারে। এতে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
আইএমএফের মতে, এই পরিস্থিতি বাস্তবায়িত হলে তা ১৯৮০ সালের পর পঞ্চম বৈশ্বিক মন্দা হিসেবে বিবেচিত হবে, যার সর্বশেষ বড় উদাহরণ ছিল কোভিড ১৯ মহামারিকালীন অর্থনৈতিক সংকট।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেলের গড় মূল্য এ বছর ১১০ ডলার এবং আগামী বছর ১২৫ ডলারে পৌঁছালে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থবিরতা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। এর প্রভাবে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়াতে হতে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও চাপে ফেলবে।
তবে সংকট দ্রুত সমাধান হলে কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনাও দেখছে আইএমএফ। সে ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যদিও তা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় কম।
মধ্যপ্রাচ্যের তেলনির্ভর অর্থনীতিগুলোও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইরানের অর্থনীতি এ বছর ৬ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে ২০২৭ সালে দেশটি পুনরায় প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারে।
এছাড়া তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের অন্যতম রপ্তানিকারক কাতার-ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২০২৬ সালে তাদের অর্থনীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিকল্প পরিবহন সক্ষমতার ওপর। যেমন সৌদি আরব নিজস্ব বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছুটা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারলেও অন্যান্য দেশগুলো বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, আগামী কয়েক মাসে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ।
