ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে। চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল সময়ে বিদেশে কর্মী পাঠানো উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত বিদেশে গিয়েছিলেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩৫১ জন কর্মী। চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ৮২ হাজার ৫৬১ জনে। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে ৬০ হাজার ৭৯০ জন কর্মী, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৪২ দশমিক ৪০ শতাংশ।
তুলনামূলক হিসাবে দেখা যায়, ২০২৪ সালের মার্চ-এপ্রিল সময়ে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা ছিল প্রায় দ্বিগুণ। ওই দুই মাসে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার ১৪ জন কর্মী বিদেশে যান।
মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধাক্কা
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে। সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতে কর্মী পাঠানো উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত বছরের একই সময়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ১০৪ জন কর্মী, যা এ বছর কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৮৭৬ জনে—হ্রাস প্রায় ৫৬ শতাংশ।
কাতারে কর্মী গেছেন ১৪ হাজার ৫৩২ জন থেকে কমে ৪ হাজার ৭২৪ জনে, অর্থাৎ ৬৯ শতাংশ কমেছে। কুয়েতে ২৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বিদেশে কর্মী পাঠানোর মোট সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৩৭। এর মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ২০৯ জনই গেছেন সৌদি আরবে। সব মিলিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে কর্মসংস্থান হয়েছে মোটের প্রায় ৭৮ শতাংশ।
অন্যান্য বাজারেও স্থবিরতা
শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, অন্যান্য শ্রমবাজারেও স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরে কর্মী পাঠানো কমেছে, আর মালয়েশিয়া, ওমান ও বাহরাইনের বাজার আগের মতোই বন্ধ রয়েছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সম্ভাবনাময় বাজারেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই।
ইউরোপের রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও পোল্যান্ডের মতো বাজারগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এসব দেশে ভিসা পেতে ভারতের নয়াদিল্লিতে যেতে হয়। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতীয় ভিসা পাওয়া কঠিন হওয়ায় অনেকেই যেতে পারছেন না।
এ ছাড়া ইউরোপে গিয়ে কর্মস্থল ত্যাগের প্রবণতা বাড়ায় নিয়োগকারীরা নতুন করে কর্মী নেওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। একই কারণে কিরগিজস্তান ও রাশিয়ার বাজারও সংকুচিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
মালয়েশিয়া বাজার নিয়ে নতুন আশা
২০২৪ সালের মে মাস থেকে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি মাসে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দেশটি সফর করে শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশই দ্রুত একটি স্বচ্ছ ও নৈতিক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে অতীতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ থাকায় নতুন করে বাজার খুললেও তা কতটা স্বচ্ছ হবে—তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
কমার পেছনে কারণ
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, শুধু যুদ্ধ নয়, আরও কিছু কারণ রয়েছে। সৌদি আরবে যেতে ‘তাকামুল’ পরীক্ষা চালু হওয়ায় অনেকেই বাদ পড়ছেন। এ ছাড়া বিদেশে গিয়ে কাজ ও বেতন না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কর্মী নিয়োগ আবার বাড়বে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন শ্রমবাজার খোঁজার পাশাপাশি পুরোনো বাজারগুলো চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং নতুন বাজার উন্মুক্ত করতে না পারলে বিদেশে কর্মসংস্থানের এই পতন দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
