চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারবিষয়ক গণভোটে। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দেশব্যাপী উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের ছিল স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।
নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, ভোট পড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩২ হাজার ৭৮৯টি কেন্দ্রে ভোটের হার ছিল ৩২.৮৮ শতাংশ, যা দুপুর ২টায় বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭.৯১ শতাংশে। রাত ৯টার দিকে নির্বাচন সচিবালয় জানায়, কয়েকটি কেন্দ্র বাদে গড়ে ৬০.৬৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।
বেসরকারি ফলাফলে দেখা যায়, ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১০ টিতে এগিয়ে বা জয়ী হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৭ টি আসন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬ টি এবং অন্যান্য প্রার্থীরা ১৪ টি আসনে বিজয়ী হয়েছেন। এতে সরকার গঠনের পথে স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা।
দিনভর বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও হাতাহাতি বা উত্তেজনার খবর মিললেও সামগ্রিকভাবে নির্বাচন ছিল শান্তিপূর্ণ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটারদের দীর্ঘ সারি, পরিবারসহ ভোটকেন্দ্রে আগমন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোট-উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রাজধানীর গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে দিনটিকে “মহা আনন্দের দিন” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এটি মুক্তির দিন এবং নতুন স্বপ্নের সূচনা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন হাই স্কুল কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার সময় ভোটার উপস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন চলছে এবং ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভোট দিয়ে দ্রুত ফল প্রকাশের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ভোটের এমন উৎসবমুখর পরিবেশ প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ছিল। তবে রাতের দিকে বিএনপির পক্ষ থেকে কয়েকটি আসনে ভোট গণনায় বিলম্ব ও ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগ তোলা হয়।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ভোট সুষ্ঠু হলে ফল মেনে নেওয়ার কথা বলেন। তবে রাতের সংবাদ সম্মেলনে তিনি কয়েকটি আসনে অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন করেন।
বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকরাও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দলের প্রধান ইভার্স ইজাবস ভোটারদের মধ্যে উদ্দীপনা লক্ষ্য করার কথা জানান। বিবিসির প্রতিনিধি যোগিতা লিমায়ে তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, আগের নির্বাচনের তুলনায় এবার রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল উন্মুক্ত ও বহুমাত্রিক।
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নসংক্রান্ত প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় এবারের ভোট ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পরই স্পষ্ট হবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কার হাতে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়া কোন গতিপথে এগোবে।
