বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সত্য, ন্যায় ও গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। তাদের মতে, সামরিক ও বেসামরিক স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক ও অনন্য। তিনি কেবল একজন রাজনীতিক নন, বরং একটি রাজনৈতিক আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভায় বক্তারা বলেন, দেশের এই সংকটময় সময়ে তার উপস্থিতি ও দিকনির্দেশনার প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি। তার মৃত্যুতে জাতি এক অপূরণীয় শূন্যতার মুখে পড়েছে, তবে তার আদর্শ চিরকাল বেঁচে থাকবে।
বক্তারা স্মরণ করেন, খালেদা জিয়া বারবার বলতেন—‘বিদেশে আমাদের বন্ধু থাকতে পারে, কিন্তু প্রভু নেই; দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা।’ এই দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদাবোধের কারণেই তার শেষ বিদায়ে মানুষের ভালোবাসা ছিল নজিরবিহীন।
শোকসভায় সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন। তিনি নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করার দাবি জানান।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, জাতির এই সন্ধিক্ষণে খালেদা জিয়ার অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। তার অনুপস্থিতিতে সবাইকে নীতিনিষ্ঠভাবে ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, খালেদা জিয়া দেশের মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তার মৃত্যুতে সময় বা ভবিষ্যৎ থেমে যায়নি; বরং তার আদর্শই আগামী বাংলাদেশের পথনির্দেশক হয়ে থাকবে।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, “খালেদা জিয়া ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে” এই বিশ্বাস থেকেই তিনি তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ভালো রাখতে হলে খালেদা জিয়ার আদর্শ ধারণ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবীর, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানসহ দেশের খ্যাতিমান সাংবাদিক ও চিন্তাবিদরা। তারা খালেদা জিয়ার সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান, তার স্ত্রী জোবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমানসহ খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তারা কোনো বক্তব্য দেননি। এছাড়া বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের সদস্য, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী, উন্নয়নকর্মী এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্তত ২৩টি দেশের কূটনীতিকরা শোকসভায় অংশ নেন।
শোকসভায় আরও অভিযোগ তোলা হয়, জীবনের শেষ সময়ে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় অবহেলা করা হয়েছে। তার চিকিৎসক অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী এ বিষয়ে তদন্তের দাবি জানান।
বেলা ৩টা ৫ মিনিটে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই নাগরিক শোকসভা বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। সভাস্থলের বাইরে বড় পর্দায় অনুষ্ঠান দেখার ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে হাজারো মানুষ খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
